জীবনের জয়গান
আজকের বিষয়টিতে একটু মন দেবেন , তবুও কিছুটা ঋণ শোধ হবে, নাহলে মহা অপরাধ হবে। ১৯৩১ সালের ৭ ই জুলাই, আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো ভারতমাতার বীরসন্তান, যশোলঙ্গ, বিক্রমপুর,ঢাকার বীরপ্রসবিনী বিনোদিনী দেবীর সন্তান দীনেশ গুপ্তকে। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বাংলাকে জাগিয়ে দিয়েছিল তিন বিপ্লবী বীরসন্তান বিনয়- বাদল- দীনেশের রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান (অলিন্দ যুদ্ধ)। এখানেই অত্যাচারী জেলসমূহের ইনস্পেক্টর জেনারেল সিমসন সাহেবকে হত্যার জন্য দীনেশের ফাঁসি হয়। হায়রে স্বাধীনতা! আমাদের স্মৃতিশক্তি কত দুর্বল! দেশের জন্য যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করলেন তাঁদের কোন দল নেই বলে, আমরা তাঁদের ভুলে যাই। আর যারা দল তৈরি করেছে, দেশ সেবার নামে নিজেদের পুঁজির পাহাড় তৈরি করেছে, আমরা এখন তাদের জয়ধ্বনি দিতেই ব্যস্ত। দেশের জন্য জীবন দেওয়া বীর সন্তানদের ইতিকথা আমাদের ইতিহাসে স্থান দেওয়া হয়নি। সেই আত্মত্যাগের ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মকে জানতে দিই না বলেই তৈরি হচ্ছে আত্মস্বার্থসম্পন্ন ভোগী নাগরিক সম্প্রদায়। দেশের কথা তো অনেক দূর, এই আত্মস্বার্থসম্পন্ন নাগরিক নিজের পরিবারেরপ্রতিও কর্তব্যবিমুখ। আত্মবিসর্জন দেওয়া দেশপ্রেমিকদের তো ভুলেইছি, আর ভুলেছি তাঁদেরকে আত্মবিসর্জন দিতে প্রেরণা দিয়েছিল যে মহাগ্রন্থ, সেই শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতাকে। ফাঁসির একদিন আগে, দীনেশ তাঁর মাকে লিখছেন একটি চিঠিতে—" মা ! আমার জন্য তুমি কেন কাঁদছো? তুমি তো জানো গীতায় (২/২২- ২৩) ভগবান বলছেন, আমরা কেবল এই দেহটি ছেড়ে যাচ্ছি, আবার নতুন দেহ ধারণ করে ফিরে আসবো। ফাঁসিতে যাচ্ছে শুধু আমার দেহ, আমি নই। অর্থাৎ আমাদের আত্মা অবিনশ্বর, তাকেই কেউ ছুঁতে পারবেনা। আত্মার মৃত্যু নেই। তুমি প্রার্থনা কর যেন পরজন্মে আমি তোমার কোলেই জন্মাতে পারি। জীবনের পরিমাপ হয় কাজের দ্বারা। তুমি ভাবছো ভগবান একি বিচার করলেন? কিন্তু তুমি জেনো ভগবান মঙ্গলময়। তাঁর সৃষ্টিতে কোন অবিচার হতে পারে না। তাঁর বিচার ঠিক চলছে। তিনি এই রঙ্গমঞ্চে আমাকে পাঠিয়েছেন, আমার পার্ট শেষ হয়েছে, তাই আমাকে ফিরে যেতে হবে তাঁর কাছে। মনে পড়ে, ছেলেবেলায় তোমার মাথার চুল নিয়ে আমি পুতুল খেলাতাম। আজ ভগবান ঠিক সেই ভাবেই আমাদের খেলাচ্ছেন। এই দেহে আমার যেটুকু করার ছিল তা সম্পন্ন হয়েছে। তাই তিনি আমায় ডেকে নিচ্ছেন।" ভেবে দেখুন, যে মহান ধর্মগ্রন্থ পড়ে একজন মানুষ দেশের জন্য তাঁর জীবনকে বলি দিতে পারেন হাসি মুখে ,আজ আমরা সেই মহান গ্রন্থকে ব্রাত্য করে রেখেছি, ধর্মনিরপেক্ষতার ন্যাকামির জন্য। অথচ গীতা কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের জন্য ধর্মগ্ৰন্থ নয়। গীতা যেকোন মানুষের জন্য মহান জীবন দর্শন, যাকে জীবনে প্রয়োগ করতে পারলে মানুষ দেবতা হয়ে উঠতে পারে।তাই সেই ত্যাগের শিক্ষা, মহানুভব হওয়ার শিক্ষা থেকে আমরা বঞ্চিত বলেই আজ আমাদের এত স্বার্থপরতা, এত ভোগের নেশা, এত দুর্দশা। হে মোর দুর্ভাগা দেশ!

