বদ্ধ-ঈশ্বরই মানব
প্রত্যেকটি ধর্মেরই আধ্যাত্মিক বাণী হলো অমরত্বের বাণী। যদি ঈশ্বর অমর হন তবে মানবও অমর, কারণ মানব ঈশ্বরের পুত্র বা ঈশ্বরের তেজকণা। ছান্দোগ্য উপনিষদে মানবের আত্মাকে ব্রহ্ম, অনন্ত ও অমর বলা হয়েছে। ত্বৎ ত্বম্ অসি— 'তুমিই সেই'। শরীর ও ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে মানবকে ক্ষুদ্র ও সীমাবদ্ধ দেখায়। কিন্তু প্রকৃত স্বরূপে মানব কোন অবস্থার দ্বারা প্রভাবিত নয়, সেই অনন্ত ও মুক্ত। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, বদ্ধ- ঈশ্বরই মানব, আর মুক্ত-মানবই ঈশ্বর। পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে। তাই আত্মার খোঁজ মানেই ব্রহ্মেরই খোঁজ—যিনি মানুষের মধ্যে সদা বিদ্যমান, সীমিত বদ্ধ সত্তার পিছনে যেন অনন্ত মুক্ত বস্তু। মানবের আত্মা তার দেহ থেকে স্বতন্ত্র। এই হলো সব নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তি। দেহ ও তার ক্ষুধার বিষয়ে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে মানুষ যা ব্যবস্থা নেয় তার প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই এই সত্য ঘোষিত হয়। পশু নিজেকে তার দেহের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্মবোধ করে, তাই সে তার ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে অসমর্থ। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রেই যখনই আত্ম-সচেতনতার নতুন মাত্রা তার অভিজ্ঞতার দিগন্ত কে ক্রমে উদ্ভাসিত করতে থাকে, তখনই এই ভ্রান্ত একাত্মবোধ থেকে আত্মাকে সরিয়ে রাখার কাজ শুরু হয়ে যায়। পশুর ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা অনাত্ম-বস্তুর জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। স্বামী বিবেকানন্দ আত্মা বিষয়ে বক্তৃতায় বলছেন —যে আত্মা জীবাত্মা রূপে আবির্ভূত হয়েছেন, তাঁর মহিমা কোন গ্রন্থ, কোন শাস্ত্র, কোন বিজ্ঞান কল্পনাও করতে পারে না। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ মহিমময় দেবতা, যিনি চিরদিন বিরাজমান, তিনিই একমাত্র দেবতা, যিনি অতীতেও ছিলেন, বর্তমানেও আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। সুতরাং মানবের কাছে ধরা পড়ে দুটি প্রকৃতি—বাহ্য জড় প্রকৃতি,আর অন্তরের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি। অনুরূপভাবে ধরা পড়ে মানবের দুটি সত্তা—নিম্নতর সত্তা যা বহিঃপ্রকৃতির সঙ্গে একাত্মভূত দেহ- মন- বিশিষ্ট জীব নিয়ে গঠিত, আর উচ্চতর সত্তা যা সব অনাত্ম- বস্তু বিবর্জিত। উপনিষদের ঋষিরা এই অনন্ত অদ্বৈত সত্তাকে অর্থাৎ আত্মাকে উপলব্ধি করেছিলেন মানবের প্রকৃত সত্তারূপে, যেখানে সূক্ষ্মতা, অন্তর্মুখীনতা ও অসীমতা স্ব স্ব সার্থকতায় পৌঁছায় চরম বিশ্বজনীনতায়।

