ঠাকুরের সর্বগ্ৰাহী ভাব
আমরা যে যেভাবে তাঁকে চাই —অরূপ বা বহুরূপ, আমাদের কাছে তিনি তা-ই। উপনিষদের সিদ্ধান্তগুলির সঙ্গে ঠাকুরের এই দৃষ্টিভঙ্গি অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। তিনি বললেন,কোনো জায়গায় ভক্তিহিমে সমুদ্র জমে যায়, আবার জ্ঞানসূর্য উঠলে গলে যায়। আবার কোনো জায়গায় নাকি বরফ কখনও গলে না। তাঁর এই রূপগুলি অরূপে পৌঁছানোর পথে যে একটি দর্শন মাত্র- তা নয়। যদি কেউ ভগবানের নিত্যস্বরূপকে ধরে থাকে, তাহলে সে যে তাঁকে লাভ করে না বা অল্প লাভ করে - তা নয়। ব্রহ্ম সমুদ্র, তা অরূপ বা স্বরূপ যাই হোক। গঙ্গাকে স্পর্শ করতে গেলে গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত ছুঁতে হয় না, গঙ্গার যে কোন জায়গা ছুঁলেই হয়। আমাদের বুদ্ধির স্বল্পতার জন্য ভাবি, আমি যেভাবে উপলব্ধি করছি, অপরে সেভাবে উপলব্ধি করেনি। আমাদের অজ্ঞতা দেখে তিনি হাসেন, ভাবেন এরা আমাকে সবটা বুঝে ফেলেছে।।! অথচ দ্বৈত, অদ্বৈত সকলে বলে, তাঁকে কেউ বুঝে ফেলতে পারে নি। প্রত্যেকে নিজের ভাবে অপরকে আনার চেষ্টা করে। শ্রীরামকৃষ্ণই ইতিহাসে অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত, যিনি সকলের সঙ্গে সমানভাবে ঈশ্বরকে আস্বাদন করতে পেরেছেন। অন্য ধর্মে কোথাও কোথাও উদারতা দেখা গেলেও সে উদারতা সীমিত। কিন্তু ঠাকুর তাঁর সর্বগ্ৰাহী অনুভূতির মধ্যে এমনভাবে সকলকে আবৃত করে নেন যে, তার বাইরে কেউ থাকে না। শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন,যে ভাবটি যার ভাল লাগে, সেই ভাব আশ্রয় করে সে তাঁকে জানুক। চরম গন্তব্যস্থলে পৌঁছালে বুঝবে অন্য পথও সেইখানেই পৌঁছাচ্ছে। পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও পরম লক্ষ্য যে ভগবান, তাঁর বৈচিত্র্য ক্ষুন্ন হলো না। তিনি বিচিত্র স্বরূপে বর্তমান। যার যেমন ভাব তার তেমন উপলব্ধি। গীতায় ভগবান বলছেন, " মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।"—সকলে সর্বপ্রকারে আমার পথেরই অনুসরণ করে। সেই আমি যে কে, এই নিয়ে খুব ঝগড়া। শাস্ত্র বলছেন - তুমি ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে কিছুই বোঝনি। তিনি অনন্ত, সর্বপ্রকারে অনন্ত।

