হট টপিক
দেশভাগের ইতিহাস জড়িয়ে নবদ্বীপের এই রথে
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন: দেশভাগের এক যন্ত্রণাময় ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এই পরিবারের সঙ্গে। ওপার বাংলার রাজশাহী জেলার নাটোরের ভুজনগাছা থেকে সব হারিয়ে এপার বাংলায় চলে আসতে হয়েছিল চক্রবর্তী পরিবারকে। আশ্রয় মিলেছিল নদীয়ার নবদ্বীপে। ভিটেমাটি হারালেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন গৃহদেবতা নীলমাধবকে। নবদ্বীপের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাচীন মায়াপুরের হালদারপাড়ার সেই চক্রবর্তী বাড়িতেই যুগ যুগ ধরে পূজিত হয়ে আসছেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। এত বছর ধরে ঘরের ভেতরেই চলত পুজো। তবে এবার ইতিহাস গড়তে চলেছে এই পরিবার। এই প্রথমবার ১৫ ফুট উঁচু লোহার দোতলা রথে চেপে মাসির বাড়ি যাত্রা করবেন চক্রবর্তী বাড়ির ‘নীলমাধব’। আর এই অভিনব রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে হালদারপাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা এখন তুঙ্গে।
দেশভাগের সেই অভিশপ্ত সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার ভুজনগাছা গ্রাম থেকে নবদ্বীপে চলে আসে চক্রবর্তী পরিবার। প্রবীণ সদস্যদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে, সে সময় ঘরবাড়ি ছাড়লেও আরাধ্য দেবতাদের তাঁরা ফেলে আসতে পারেননি। নবদ্বীপে এসে নতুন করে সংসার পাতার পাশাপাশি পরম নিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠা করা হয় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ। চক্রবর্তীদের অন্দরমহলে এই জগন্নাথদেব ‘নীলমাধব’ নামেই পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে পারিবারিক ঘেরাটোপেই শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশে দৈনিক পুজো ও আরাধনা পেয়ে এসেছেন এই তিন ভাই-বোন।
এতদিন চক্রবর্তী বাড়ির পুজোর কথা কেবল প্রতিবেশীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার সেই পুজোই ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে সর্বজনীন রূপ নিতে চলেছে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এবারই প্রথম তিন বিগ্রহকে রথে বসিয়ে মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে। তার জন্য তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল লোহার রথ। সম্পূর্ণ লোহা দিয়ে নির্মিত এই রথটি প্রায় ১৫ ফুট উঁচু এবং দোতলা বিশিষ্ট। নবদ্বীপে বহু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা থাকলেও, প্রাচীন মায়াপুর হালদারপাড়া এলাকায় চক্রবর্তী বাড়ির এই নতুন উদ্যোগকে ঘিরে এক আলাদা উন্মাদনা তৈরি হয়েছে।
প্রথমবারের এই রথযাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে কোমর বেঁধে নেমেছেন হালদারপাড়ার সাধারণ বাসিন্দারাও। রথের দড়িতে টান দিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন আপামর আবালবৃদ্ধবনিতা। চক্রবর্তী পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল পারিবারিক রীতিনীতি নয়, এখন এই পুজোয় পাড়ার প্রতিটি মানুষ শামিল হয়েছেন। ১৫ ফুটের এই সুদৃশ্য লোহার রথটি যখন প্রাচীন মায়াপুরের রাস্তা দিয়ে যাবে, তখন তা দেখার জন্য ভিড় জমবে বলেই আশা করছেন উদ্যোক্তারা। সব মিলিয়ে, দেশভাগের স্মৃতিবাহী চক্রবর্তী বাড়ির ‘নীলমাধব’ এবার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন নবদ্বীপের রথযাত্রার ইতিহাসে।

