হট টপিক
পুরীর পরেই ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বাংলার এই রথ
প্রকাশিত: ১০ জুলাই, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদনঃ পুরীর পরেই ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং বাংলার বৃহত্তম রথ উৎসব হুগলির মাহেশের রথযাত্রা। প্রায় সাড়ে ছ’শো বছরের প্রাচীন এই ঐতিহাসিক উৎসব আজও তার নিজস্ব ঐতিহ্য, বনেদিয়ানা এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখেছে। চৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতিবিজড়িত শ্রীরামপুরের মাহেশের এই রথযাত্রা দেখতে প্রতি বছর আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়ায় দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে গঙ্গার পাশেই এই জনপদে।
মাহেশের জগন্নাথ মন্দির এবং এই রথযাত্রার সূচনা নিয়ে ইতিহাস ও লোকশ্রুতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। চতুর্দশ শতকে, ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামের এক পরম জগন্নাথ ভক্ত পুরী গিয়ে মহাপ্রভুর দর্শন না পেয়ে আমরণ অনশনের সংকল্প করেন। কথিত আছে, জগন্নাথ দেব তাঁকে স্বপ্নে নির্দেশ দেন গঙ্গার পশ্চিম তীরে মাহেশে গিয়ে বিগ্রহ তৈরি করে পুজো করার। স্বপ্নাদেশ পেয়ে ধ্রুবানন্দ মাহেশে আসেন এবং গঙ্গার ঘাটে ভেসে আসা একটি নিমকাঠের গুঁড়ি দিয়ে বলরাম, সুভদ্রা ও জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ তৈরি করেন। পরবর্তীতে, ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে পুরী যাওয়ার পথে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মাহেশের এই মন্দির দর্শন করে ভাববিহ্বল হয়ে পড়েন এবং এই স্থানের নাম দেন ‘নবনীলাচল’।
মাহেশের বর্তমান রথটি তৈরি হয়েছিল ১৮৮৫ সালে, যা আজও সগৌরবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কলকাতার শ্যামবাজারের বিখ্যাত বসু পরিবারের সদস্য কৃষ্ণচন্দ্র বসুর দেওয়া দু’লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তায় মার্টিন বার্ন কোম্পানির তত্ত্বাবধানে এই রথটি নির্মিত হয়। সম্পূর্ণ লোহার তৈরি এই নবরত্ন (৯টি চূড়া বিশিষ্ট) রথটির উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট এবং এর ওজন প্রায় ১২৫ টন। রথটিতে মোট ১২টি বিশালাকার লোহার চাকা রয়েছে। রথের সামনে বসানো থাকে কাঠের চারটি ঘোড়া (দুটি সাদা ও দুটি কালো) এবং সারথি ‘দারুক’-এর মূর্তি।
পুরীর জগন্নাথ দেবের উৎসবের সঙ্গে মাহেশের রথযাত্রার রীতিনীতিতে গভীর মিল রয়েছে। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় স্নানযাত্রার দিন ২৮ ঘড়া গঙ্গাজল এবং দুধ দিয়ে জগন্নাথ দেবের মহাস্নান করানো হয়। এরপরই গর্ভগৃহে দীর্ঘ ১৫ দিন ধরে চলে প্রভুর ‘অঙ্গরাগ’ বা রং পরিবর্তনের বিশেষ গোপন আচার। এই সময় ভক্তদের জন্য দর্শন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, যাকে শাস্ত্রের ভাষায় 'অনবসর' বলা হয়। আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়ায় নতুন সাজে সেজে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে রথে চাপিয়ে মাসির বাড়ি (গুন্ডিচা মন্দির)-র উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ‘সোজা রথ’ নামে পরিচিত। দীর্ঘ ৯ দিন মাসির বাড়িতে থাকার পর, আষাঢ়ের দশমী তিথিতে দেবতারা আবার মূল মন্দিরে ফিরে আসেন, যাকে বলা হয় ‘উল্টো রথযাত্রা’।
মাহেশের রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে জিটি রোডের ধারে এক মাস ব্যাপী বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য কোলাজ দেখা যায় এই মেলায়। গরমাগরম জিলিপি, পাঁপড় ভাজা, মাটির তৈজসপত্র, বাঁশি এবং রকমারি গাছের চারা বিক্রির জন্য এই মেলা শতাব্দী প্রাচীন কাল ধরে বিখ্যাত। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কালজয়ী উপন্যাস 'রাধারানী'-র কাহিনীর পটভূমিও গড়ে উঠেছিল এই ঐতিহাসিক মাহেশের রথের মেলায় রাধারানীর হারিয়ে যাওয়া এবং রথের অন্ধকারের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই।

