মানুষের মূল্য বৃদ্ধি হয়
সম্রাট জাহাঙ্গীর সন্ত তুলসীদাসকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। একদিন সম্রাট তুলসীদাসজীক বেশ কিছু অর্থ দেবার ইচ্ছা করেন। তুলসীদাস বলেন : প্রভুর ভক্তি সাধনায় যে ডুবে থাকতে চায়, তার পক্ষে ধন সঞ্চয় একেবারে বর্জনীয়। অর্থ চিন্তা ও আনুষঙ্গিক উদ্বেগ মনকে নষ্ট করে দেয়, তা দিয়ে আর ঈশ্বর চিন্তা চলে না। অন্য একটা সময়ে জাহাঙ্গীর মন্তব্য করেছিলেন: সন্তজী, আমাদের মন্ত্রী বীরবল খুবই জ্ঞানী। তুলসীদাস উত্তরে বলেন: তা হতে পারে, কিন্তু এরূপ মূল্যবান গুণে ভূষিত অথচ নশ্বর এই দেহের অধিকারী হয়ে তিনি যদি ঈশ্বরোপলব্ধির পথটা না খোঁজেন, তবে তার থেকে মূর্খ আর কেউ নেই। তিনি যেমন সফল বাকচাতুর্যপটু—তা জ্ঞানীর লক্ষণ নয় ; ঈশ্বরোপলব্ধিতেই জ্ঞান নিহিত আছে। মহারাজ মান সিং ও তার ভাই এবং অন্য রাজপুত্ররা প্রায়ই তুলসীদাসের দর্শনে যেতেন ও তাঁর প্রতি ভূয়সী শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেন। একবার একজন তুলসীদাসজীক প্রশ্ন করেন, কেন এইসব লোকেরা তাঁকে এত দর্শন করতে আসতেন, অথচ এর পূর্বে তো কেউ আসতেন না? উত্তরই তুলসীদাস বলেন : একদা আমি ভিক্ষা করতাম। তখন একটা কানা কড়িও ভিক্ষার ঝুলিতে পড়তো না। তখন কেউ আমাকে চাইতো না। কিন্তু গরিবের পালক রাম, আমার মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন রাজারাও আমার পাদবন্দনা করে। তখন রাম আমার কাছে ছিলেন না ; এখন রামই আমার সহায়। অনুরূপ ভাবনা, রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে পাই। কবিগুরু লিখছেন- 'শুধু ধূলি শুধু ছাই, মূল্য তার কিছু নাই, মূল্য তারে কর সমর্পণ, স্পর্শে তব পরশরতন। তোমারি গৌরবে যবে আমার গৌরব হবে। সব তবে দিব বিসর্জন— আমার হৃদয় প্রাণমন। অর্থাৎ এই দেহের বা এই জীবনের মূল্য ততক্ষণই, যতক্ষণ এরমধ্যে ঈশ্বর বিরাজ করেন। তিনি ছাড়া এই দেহের কোন মূল্য নেই। যখন আতমা এই দেহ ছেড়ে চলে যান তখন এ দেহ কবরে গেলে হয় ধূলি, অথবা আগুনে পুড়ে হয় ছাই। সুতরাং ঈশ্বরমুখী ভাবনা এবং ঈশ্বরকে ধরে চলতে পারলেই মানুষ স্বার্থপরতার গণ্ডী অতিক্রম করে পরার্থপর হয়। মানুষের হৃদয় সংকীর্ণতা ভেঙে প্রসারিত হয়। স্বামীজী বলছেন, সংকোচনই মৃত্যু, প্রসারণই জীবন। যে শুধু নিজের জন্য বাঁচে সে জীবন্মৃত। আর সকলের জন্য বাঁচলে সেই জীবনই হয় মূল্যবান। যে মানুষ বেশি নেয় সে খায় ভালো। আর যে মানুষ বেশি দেয় সে ঘুমায় ভালো।

