খাদ্যরসিক সন্ন্যাসী: স্বামী বিবেকানন্দের রন্ধনপ্রেম
বিশেষ প্রতিবেদনঃ স্বামী বিবেকানন্দ মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে গেরুয়া বসনধারী, গম্ভীর স্বভাবের এক বিশ্ববিখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরু। কিন্তু এই কঠোর সন্ন্যাসী রূপের বাইরেও তাঁর আরও একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন এক পরম খাদ্যরসিক, ভোজনপ্রিয় মানুষ এবং অত্যন্ত দক্ষ এক রাঁধুনি। প্রচলিত অর্থে সাধু-সন্ন্যাসীদের খাওয়া-দাওয়ার ওপর যে কঠোর বিধিনিষেধ বা নিরামিষ আহারের ধারণা থাকে, স্বামীজি ছিলেন তার চেয়ে অনেকটাই ব্যতিক্রমী। তিনি মন থেকে বিশ্বাস করতেন, শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পুষ্টিকর আহারের অত্যন্ত প্রয়োজন।
শৈশব থেকেই কলকাতার বনেদি কায়েস্থ পরিবারের সন্তান নরেন্দ্রনাথ দত্ত (বিবেকানন্দের পূর্বাশ্রমের নাম) বেশ রাজকীয় খাওয়া-দাওয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি আমিষ খেতে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ইলিশ মাছ ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয়। বিশেষ করে সর্ষে ইলিশ, ইলিশের টক এবং ইলিশের ডিমের বড়া তিনি পরম তৃপ্তি সহকারে খেতেন। শোনা যায়, ইলিশের মরশুমে বেলুড় মঠে প্রায়ই ইলিশের এলাহি আয়োজন হতো। মাছের পাশাপাশি পাঁঠার মাংসের প্রতিও তাঁর দুর্বলতা ছিল। তবে মঠে থাকাকালীন সাধারণ মাষকলাইয়ের ডাল, আলুভাতে এবং সুগন্ধি চালের খিচুড়িও তিনি দারুণ পছন্দ করতেন। মিষ্টির মধ্যে রাজভোগ এবং গরম রসগোল্লা খেতে তিনি ভালোবাসতেন।
বিবেকানন্দ শুধু খেতেই ভালোবাসতেন না, অন্যকে খাওয়াতেও পছন্দ করতেন। তিনি নিজে অত্যন্ত উঁচুদরের রাঁধুনি ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি একটি রান্নার দল বা 'গ্রিডি ক্লাব' (Greedy Club) তৈরি করেছিলেন, যেখানে বন্ধুরা মিলে নতুন নতুন পদ আবিষ্কার ও রান্না করতেন। তিনি রান্নার ওপর প্রচুর বই পড়তেন এবং মশলার পরিমিত ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তাঁর হাতের তৈরি ‘পাঁঠার মাংসের ঝোল’ এবং ‘খাসির কোর্মা’ খেয়ে রামকৃষ্ণদেবের অন্য শিষ্যেরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন। রান্না করার সময় তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে কড়া নজর রাখতেন।
স্বামীজির খাদ্যতালিকায় চা ছিল এক অপরিহার্য অঙ্গ। তিনি দিনে বহুবার চা পান করতেন। চা তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব একটি পদ্ধতি ছিল। সেই যুগে বেলুড় মঠে চা খাওয়া নিয়ে অনেক রক্ষণশীল মানুষ আপত্তি তুললেও, স্বামীজি চা পানের পক্ষেই সওয়াল করেছিলেন। পাশ্চাত্যে থাকাকালীন তিনি কড়া কফি পানে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। আইসক্রিম এবং সোডা ওয়াটারও তাঁর বেশ প্রিয় ছিল।
বিবেকানন্দ খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় বা জাতপাতের গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দিতেন না। তিনি মনে করতেন, তীব্র ক্ষুধা নিয়ে আধ্যাত্মিকতা চর্চা করা অসম্ভব। তাই তিনি বলতেন, "আগে পেট পুজো, তারপর ধর্ম।" পাশ্চাত্যে ভ্রমণের সময় তিনি সেখানকার খাদ্যাভ্যাসকে সহজভাবে গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে তিনি ফরাসি রান্না, স্যুপ ও বিভিন্ন ধরনের মাংসের পদ সানন্দে খেয়েছেন। আবার ভারতে ফিরে এসেও সাধারণ মানুষের ডাল-রুটি খেতে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না।
জীবনের শেষ দিনটিতেও (৪ জুলাই, ১৯০২) তিনি বেলুড় মঠে ইলিশ মাছের ঝোল এবং ভাত দিয়ে দুপুরের আহার সেরেছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার প্রতি তাঁর এই সহজ ও স্বাভাবিক ভালোবাসা প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল অলৌকিক জগতের সন্ন্যাসী ছিলেন না, বরং মাটির পৃথিবীর সাধারণ জীবনের রসাস্বাদন করতেও সমান ভালোবাসতেন।

