বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

স্মরণে প্রসন্নকুমার: ঊনবিংশ শতকের আলোকবর্তিকা ও এক আধুনিক বাঙালি

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৬
স্মরণে প্রসন্নকুমার: ঊনবিংশ শতকের আলোকবর্তিকা ও এক আধুনিক বাঙালি
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশেষ প্রতিবেদন: ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে যে ক’জন ব্যক্তিত্ব সমাজ সংস্কার, আধুনিক শিক্ষা ও আইনের আঙিনায় নিজেদের অক্ষয় করে রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অগ্রগণ্য নাম প্রসন্নকুমার ঠাকুর। ৩০ অগস্ট তাঁর প্রয়াণ দিবস। পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর পরিবারের এই প্রবাদপ্রতিম সন্তান ১৮৬৮ সালের এই দিনটিতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের এক প্রভাবশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও, ইংরেজি শিক্ষা বিস্তার, থিয়েটারের সূচনা এবং আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি যে আধুনিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আজ তাঁর প্রয়াণলগ্নে স্বতন্ত্র খবর আন্তরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে। 

১৮০১ সালের ২১ ডিসেম্বর কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন প্রসন্নকুমার ঠাকুর। তিনি ছিলেন হিন্দু কলেজের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা গোপীমোহন ঠাকুরের পুত্র। ফলে শৈশব থেকেই এক উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত পরিবেশ পেয়েছিলেন তিনি। গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাথমিক পাঠ শেষ করার পর তিনি শেরবোর্ন স্কুল এবং পরবর্তীতে সদ্য প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি সনাতন হিন্দু স্মৃতিশাস্ত্র এবং পাশ্চাত্য আইনশাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর কর্মজীবনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল।
পারিবারিক বিপুল জমিদারি ও প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও প্রসন্নকুমার কেবল আরাম-আয়েশে জীবন কাটানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি ওকালতি পেশাকে বেছে নেন এবং তৎকালীন দেওয়ানি আদালতে (সিভিল কোর্ট) প্র্যাকটিস শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মেধা ও যুক্তিবাদী মনন ব্রিটিশ বিচারকদের নজর কাড়ে এবং তিনি সরকারি আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত হন।
তৎকালীন সময়ে আদালতের সমস্ত কাজ ফার্সি কিংবা ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হতো। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই বিচারপ্রক্রিয়া বোঝা অসম্ভব ছিল। প্রসন্নকুমার ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো, তাঁর হাত ধরেই প্রথমবার আদালতের প্রশাসনিক স্তরে বাংলা ভাষার প্রবেশ ঘটে। সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে তিনি আদালতের কাজে মাতৃভাষা ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিলেন, যা তৎকালীন বিচারব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৫৪ সালে লর্ড ডালহৌসি তাঁকে গভর্নর জেনারেলের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের ক্লার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত করেন, যেখানে তিনি নিজের প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেন।
প্রসন্নকুমার ঠাকুর মূলত হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল ধারার প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা রদের আন্দোলনের বিরোধী হিসেবে পরিচিত ‘ধর্মসভা’-র সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তবে রক্ষণশীলতার আবরণ থাকলেও আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়াতে তিনি কখনও কার্পণ্য করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষা ছাড়া ভারতীয় সমাজের সার্বিক মুক্তি সম্ভব নয়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি তাঁর অর্জিত বিপুল সম্পত্তির একটি বড় অংশ শিক্ষার উদ্দেশ্যে দান করে যান। তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর উইল অনুযায়ী প্রদত্ত অর্থ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত ‘ট্যাগোর ল প্রফেসিশিপ’ (Tagore Law Professorship)। দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত আইনবিদরা এই চেয়ার অলঙ্কৃত করে বক্তৃতা দিতে আসতেন, যা ভারতীয় আইনি শিক্ষার মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
বাঙালি সমাজকে আধুনিক নাট্যচর্চার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রসন্নকুমার ঠাকুর এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৭৯৬ সালে রুশ পণ্ডিত গেরাসিম লেবেদেভ কলকাতায় প্রথম থিয়েটারের সূচনা করলেও তা স্থায়ী রূপ পায়নি। প্রসন্নকুমার সেই ধারাকে পুনরায় পুনরুজ্জীবিত করেন। ১৮৩২ সালে তিনি উত্তর কলকাতার নারকেলডাঙায় নিজের বাসভবনে একটি অস্থায়ী নাট্যমঞ্চ বা অডিটোরিয়াম গড়ে তোলেন। সেখানে মূলত বেশ কিছু ইংরেজি নাটকের সফল মঞ্চায়ন হয়েছিল। যদিও এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত পেশাদার থিয়েটার ছিল না, তবুও এটিই ছিল আধুনিক বাঙালি বাবুদের নাট্যচর্চার আদি সোপান, যা পরবর্তীতে বাংলায় থিয়েটার বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল।
প্রসন্নকুমার ঠাকুরের জীবন কেবল সাফল্য আর খ্যাতির আলোয় মোড়া ছিল না, এর পেছনে ছিল এক গভীর পারিবারিক ট্র্যাজেডিও। তিনি আজীবন খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মান্তকরণ প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে এসেছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে, তাঁর একমাত্র অত্যন্ত মেধাবী পুত্র জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর ১৮৫১ সালে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা কমলমণিকে বিবাহ করেন।
এই ঘটনায় তীব্র আঘাত পান প্রসন্নকুমার। তিনি পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন এবং পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন। উল্লেখ্য, এই জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে লিনকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন এবং লণ্ডনে হিন্দু আইন ও বাংলা ভাষার অধ্যাপক হন। পিতার মৃত্যুর পর জ্ঞানেন্দ্রমোহন সম্পত্তির দাবিতে আদালতে মামলাও করেছিলেন, যা তৎকালীন কলকাতার বুকে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল। 
১৮৬৮ সালের ৩০ অগস্ট, ৬৬ বছর বয়সে কলকাতার বুকে অবসান ঘটে এই কর্মযোগী পুরুষের। প্রসন্নকুমার ঠাকুরের চরিত্রের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য ছিল— একদিকে তিনি ছিলেন সনাতন হিন্দু ধর্মের গোঁড়া সমর্থক, অন্য দিকে চিন্তাভাবনায় ছিলেন ঘোরতর আধুনিক, যিনি আইন, শিক্ষা ও থিয়েটারের মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার ‘ট্যাগোর ক্যাসেল’ কিংবা গঙ্গার ধারের ‘প্রসন্নকুমার ঠাকুর ঘাট’ আজও সেই বর্ণময় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে, ঊনবিংশ শতকের এই মহান সমাজ সংস্কারক তথা আধুনিক মননের বাঙালিকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছে স্বতন্ত্র খবর।

আরও হট টপিক