বিশেষ প্রতিবেদন: রথযাত্রা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরীর জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার ছবি। কিন্তু রাঢ়বঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাক্ত তীর্থভূমি বীরভূমের তারাপীঠে এই উৎসবের রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। সনাতন বিশ্বাস অনুসারে, মা তারা এখানে একাধারে কালী ও কৃষ্ণ। তাই রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে জগন্নাথের প্রতিভূ বা রূপ হিসেবে স্বয়ং মা তারা রাজবেশে সুসজ্জিত হয়ে রথে চড়ে ভক্তদের দর্শন দেন। তারাপীঠের রথযাত্রা এবার এক অনন্য ঐতিহাসিক মাত্রা ছুঁয়েছে। বাংলার ২৫টি ঐতিহ্যবাহী রথের তালিকায় মা তারার রথ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর, রাজ্য সরকারের সংস্কৃতি দফতরের পক্ষ থেকে সেবাইত সমিতিকে ৫ লক্ষ টাকার বিশেষ আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। মন্দির কমিটির নিজস্ব তহবিল এবং এই অনুদানের সাহায্যে এবার পুরনো জরাজীর্ণ রথ বদলে সম্পূর্ণ নতুনভাবে শাল ও সেগুন কাঠ দিয়ে এক সুদৃশ্য, মজবুত ও নান্দনিক রথ নির্মাণ করা হয়েছে।
তারাপীঠের ইতিহাসে রথযাত্রার সূচনা এক অলৌকিক অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত। ১৮৬৭ সালে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করার পর মহাযোগী সাধক বামাক্ষ্যাপা প্রথম এই মন্দিরে রথের দড়ি টেনেছিলেন। সেই থেকে প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ধুমধাম করে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বছরের অন্যান্য দিনগুলিতে গর্ভগৃহের বাইরে মায়ের মূল বিগ্রহকে আনা নিষিদ্ধ হলেও, রথযাত্রার এই একটি মাত্র দিনে সেই নিয়ম শিথিল হয়। মায়ের মূল চরণ ও বিগ্রহকে গর্ভগৃহ থেকে বের করে মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বারের সামনে এনে রথে স্থাপন করা হয়।
উৎসবের দিন ভোর থেকেই তারাপীঠ মন্দিরে শুরু হয়ে যায় বিশেষ তান্ত্রিক আচার ও পুজো। সাধারণ দিনের মতো অন্নভোগের পাশাপাশি এই দিন মা তারাকে বেনারসী শাড়ি পরিয়ে দেওয়া হয় এবং অপরাজিতা, জবা, রজনীগন্ধা, করবীর মতো ফুল ও শ্মশানের দেবদারু পাতা দিয়ে অপূর্ব রাজবেশে সাজানো হয়। শৃঙ্গার আরতির পর মাকে চিঁড়ে, পাঁচ রকমের মিষ্টি ও ফল অর্পণ করা হয়। এই দিনের প্রধান আকর্ষণ হলো মায়ের প্রিয় ‘জিলিপি ভোগ’ নিবেদন। দুপুরের দিকে মূল বিগ্রহকে মহাসমারোহে এনে নতুন তৈরি হওয়া সেগুন কাঠের সুসজ্জিত রথে আসীন করানো হয়।
নতুন এই রথটি তৈরির সময় প্রাচীন ঐতিহ্যের দিকেও বিশেষ নজর রাখা হয়েছে। পুরনো রথটির কাঠামো নষ্ট হয়ে গেলেও তার স্মৃতি ও মাহাত্ম্য বজায় রাখতে প্রাচীন চাকা দুটি এবং ধুরিটি নতুন রথে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাকি সম্পূর্ণ কাঠামোটি অত্যন্ত নিখুঁত কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দুপুরের বিশেষ পূজার পর যখন মায়ের জয়ধ্বনি দিয়ে রথের দড়িতে টান পড়ে, তখন তারাপীঠ প্রাঙ্গণে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শঙ্খধ্বনি, ঢাকের আওয়াজ এবং ‘জয় মা তারা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শ্মশান সংলগ্ন সমগ্র চত্বর।
এ বছর সরকারি স্বীকৃতি মেলার পর ভক্তদের জন্য বিশেষ সুরক্ষামূলক ও আকর্ষণীয় ব্যবস্থা নিয়েছে তারাপীঠ মন্দির কমিটি। রথযাত্রার রুট জুড়ে বড় বড় স্ক্রিন লাগিয়ে লাইভ টেলিকাস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের জন্য বিশেষ প্রসাদ বিতরণ, সুগন্ধি স্প্রে ছিটানো, সার্বক্ষণিক হরিণাম সংকীর্তন দল এবং আপদকালীন চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ক্যাম্প ও অ্যাম্বুলেন্স মজুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় সেবাইতদের মতে, এই রাজকীয় স্বীকৃতি ও নতুন রথের সূচনা আগামী দিনে তারাপীঠের পর্যটন ও আধ্যাত্মিক গরিমাকে বিশ্বমঞ্চে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।