বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
সর্বশেষ খবর

ভারতীয় সাংবাদিকতার ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’ তুষারকান্তি ঘোষ

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট, ২০২৬
ভারতীয় সাংবাদিকতার ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’ তুষারকান্তি ঘোষ
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশেষ প্রতিবেদনঃ আজ ২৯ আগস্ট, ভারতীয় সাংবাদিকতার ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’ তুষারকান্তি ঘোষের প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৪ সালের আজকের দিনেই কলকাতার এক হাসপাতালে ৯৫ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই প্রবাদপ্রতিম বাঙালি সাংবাদিক। দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কলকাতার খ্যাতনামা ইংরেজি দৈনিক ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। ভারতের মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতায় তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তাঁকে দেশের সংবাদ জগতের ‘ডিন অফ ইন্ডিয়ান জার্নালিজম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। শুধু জাতীয় স্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি বাঙালি মেধার জয়জয়কার ঘোষণা করেছিলেন।
১৮৯৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত সাংবাদিক পরিবারে তুষারকান্তি ঘোষের জন্ম হয়। তাঁর পিতা শিশির কুমার ঘোষ ছিলেন ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক। ফলে শৈশব থেকেই খবরের কাগজের পরিবেশ এবং সাংবাদিকতার আদর্শের মধ্যেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। কলকাতার টাউন স্কুল এবং ঐতিহ্যবাহী হিন্দু স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ১৯২০ সালে বি.এ পাস করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করেই তিনি কোনো অন্য পেশার কথা না ভেবে বাবার তৈরি করা ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-য় শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে নিজের যোগ্যতা ও কঠোর পরিশ্রমের পরিচয় দিয়ে দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন এবং ১৯২৮ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। আমৃত্যু তিনি এই পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন।
তুষারকান্তি ঘোষের সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন। তিনি ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক। তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের দমন-পীড়ন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল আপসহীন। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন তুঙ্গে, তখন তাঁর ধারালো সম্পাদকীয় ব্রিটিশ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
ব্রিটিশ শাসকদের রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে সত্য প্রকাশের অপরাধে ১৯৩৫ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। বিচার ও শাসন বিভাগের অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি কড়া সম্পাদকীয় লেখার কারণে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু জেলখানা বা ব্রিটিশদের ভয় দেখানোর নীতি তাঁর অদম্য জেদকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং জেল থেকে মুক্তির পর দ্বিগুণ উৎসাহে তিনি ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ও ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে শুরু করেন। এই সময়কালে তিনি দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরুর মতো মহান নেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন।
ইংরেজি ভাষার পাঠকদের কাছে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ যেমন জনপ্রিয় ছিল, তেমনই বাংলার আপামর জনসাধারণের কাছে পৌঁছানোর জন্য তুষারকান্তি ঘোষ ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলা দৈনিক ‘যুগান্তর’। খুব কম সময়ের মধ্যেই ‘যুগান্তর’ বাঙালি মননে এবং বাংলার সংবাদ জগতে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে তিনি নিজেই এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
সংবাদপত্র প্রকাশের এই জয়যাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। উত্তর ভারতের পাঠকদের কথা মাথায় রেখে তিনি এলাহাবাদ থেকে প্রকাশ করেন ‘দ্য নর্দার্ন ইন্ডিয়ান পত্রিকা’। এছাড়া ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে তাঁর সুনিপুণ সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করে বিখ্যাত সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকা ‘অমৃত’। সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ এবং নতুন সাহিত্যিকদের মঞ্চ তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিল অনন্য। একই সাথে তিনি দেশের অন্যতম প্রধান সংবাদ সংস্থা ‘ইউনাইটেড নিউজ অফ ইন্ডিয়া’ (UNI)-এর অন্যতম ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন।
তুষারকান্তি ঘোষ কেবল কলকাতার বা ভারতের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ১৯৪৬ সাল থেকে একজন প্রথিতযশা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক হিসেবে তিনি বার বার বিশ্ব পরিভ্রমণ করেছেন। আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব করেছেন অত্যন্ত মর্যাদার সাথে। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিকতা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট’ (IPI) এবং ‘কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়ন’ (CPU)-এর মতো প্রথম সারির আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সভাপতি হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বমঞ্চে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত জোরালো। বিশ্বের বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুসম্পর্ক ছিল।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তুষারকান্তি ঘোষের একটি চমৎকার সাহিত্যিক সত্তা ছিল। তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক এবং শিশুসাহিত্যিক। তাঁর সহজ-সরল ও সাবলীল ভাষা ছোট-বড় সব ধরনের পাঠককেই মুগ্ধ করত। শিশুদের জন্য লেখা তাঁর গল্প ও বইগুলি একসময় বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা এবং দেশের সাহিত্যে তাঁর এই অসামান্য ও দীর্ঘকালীন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার ১৯৬৪ সালে তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’-এ ভূষিত করে। এই সম্মান কেবল তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ছিল না, বরং তা ছিল সমগ্র বাঙালি সাংবাদিকতা জগতের এক বিরাট গৌরব।

বহু আন্তর্জাতিক সম্মান ও প্রতিপত্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তুষারকান্তি ঘোষ আজীবন এক অত্যন্ত সহজ-সরল এবং অনড় আদর্শবাদী জীবনযাপন করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংবাদমাধ্যমের আসল শক্তি হলো সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা। কোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রাতিষ্ঠানিক লোভের কাছে মাথা নত না করে সত্যকে সাহসের সাথে তুলে ধরাই ছিল তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র। তরুণ সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক এবং পথপ্রদর্শক।
১৯৯৪ সালের ২৯ আগস্ট এই মহান সাংবাদিকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে ভারতীয় সাংবাদিকতার একটি স্বর্ণযুগের অবসান হয়। বর্তমানে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ বা ‘যুগান্তর’ কালের নিয়মে বন্ধ হয়ে গেলেও, তুষারকান্তি ঘোষের রেখে যাওয়া নির্ভীক সাংবাদিকতার আদর্শ আজও এদেশের মুক্ত সংবাদমাধ্যমের জন্য এক আলোকবর্তিকা। আজকের এই বিশেষ দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হচ্ছে বাংলা তথা ভারতের সংবাদ জগতের এই প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্রকে। স্বতন্ত্র খবর তাঁকে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাচ্ছে।

আরও খবর