বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

স্নানযাত্রা: ঈশ্বরও মানুষের মতো—এই উপলব্ধির উৎসব

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬
স্নানযাত্রা: ঈশ্বরও মানুষের মতো—এই উপলব্ধির উৎসব
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

জয় জগন্নাথ।

প্রখর রোদে যখন পৃথিবী তপ্ত, তখন শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে ১০৮ কলস পবিত্র জল দিয়ে মহাস্নান করানো হয়। এই আচার শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ভারতীয় ভাবদর্শনের এক গভীর মানবিক শিক্ষা। দেবতার স্নানকে কেন্দ্র করে যে উৎসব, তার অন্তরে লুকিয়ে আছে মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের নিবিড় আত্মীয়তার এক অনন্য দর্শন।সাধারণত আমরা ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ ও অলৌকিক সত্তা হিসেবে ভাবি। কিন্তু জগন্নাথ সংস্কৃতি সেই ধারণাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। এখানে ঈশ্বর মানুষের মতোই স্নান করেন, অসুস্থ হন, বিশ্রাম নেন, পথ চলেন, মানুষের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ান। দেবত্ব এখানে দূর আকাশে নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যেই ধরা দেয়। এই কারণেই স্নানযাত্রা কেবল একটি আচার নয়, একটি উৎসব। কারণ উৎসব মানে শুধু আনন্দ নয়, একসঙ্গে একটি মূল্যবোধকে উদ্‌যাপন করা। স্নানযাত্রা উদ্‌যাপন করে ঈশ্বর ও মানুষের দূরত্ব ঘুচে যাওয়ার আনন্দ।

মহাস্নানের পরে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী জগন্নাথ বিশ্রামে যান। অতিরিক্ত স্নানের ফলে তাঁর জ্বর আসে। তাই মন্দিরের দরজা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকে। তাঁকে ভেষজ ওষুধ দেওয়া হয়, বিশ্রাম করানো হয়। প্রশ্ন জাগতেই পারে—সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের আবার অসুস্থতা কেন? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে স্নানযাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ভারতীয় ধর্মদর্শন কখনও ঈশ্বরকে মানুষের নাগালের বাইরে সরিয়ে রাখেনি। বরং বলেছে, মানুষের সুখ-দুঃখ, রোগ-শোক, ক্লান্তি—সবকিছুর মধ্যেই ঈশ্বর অংশ নেন।উ মানুষের অভিজ্ঞতাকে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা করে তোলেন। তাই মানুষের কষ্ট কখনও তুচ্ছ নয়।

স্নানযাত্রা আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়—শরীরের যত্ন নেওয়াও ধর্মের অংশ। স্নানের পর বিশ্রাম, চিকিৎসা, আরোগ্য—এসবকে আধ্যাত্মিক জীবনের বাইরের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি। সুস্থতা এবং সংযমও এখানে সাধনার অংশ।

এই উৎসবের আরেকটি সামাজিক তাৎপর্য আছে। জগন্নাথকে বলা হয় "জগতের নাথ"। তাঁর কাছে জাতি, বর্ণ, ধনী, দরিদ্রের ভেদরেখা ক্ষীণ। স্নানযাত্রা থেকে রথযাত্রা—এই পুরো পর্বে ভগবান যেন মন্দিরের অন্তরাল থেকে বেরিয়ে মানুষের কাছে চলে আসেন। ধর্ম তখন কেবল মন্দিরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষের সমাজে, রাস্তায়, জনজীবনে নেমে আসে।

আধুনিক সময়ে এই উৎসবের শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। আজ মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানসিকভাবে ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে। স্নানযাত্রা মনে করিয়ে দেয়—মমতা, পরিচর্যা, বিশ্রাম, সহমর্মিতা—এসবই সভ্যতার অপরিহার্য মূল্যবোধ। যে সমাজ অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, যে পরিবার ক্লান্ত মানুষকে বিশ্রামের সুযোগ দেয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে ধর্মের চর্চা করে। তাই স্নানযাত্রা শুধু দেবতার স্নান নয়; এটি মানুষের হৃদয়কে স্নিগ্ধ করারও আচার। এটি আমাদের শেখায়, ঈশ্বরকে খুঁজতে হলে মানুষের জীবন, মানুষের অনুভূতি এবং মানুষের সেবার মধ্যেই তাঁকে দেখতে হবে।

স্নানযাত্রার পরেই শুরু হয় অপেক্ষা—বিশ্রাম, চিকিৎসা, নবযৌবন দর্শন এবং শেষে রথযাত্রা। যেন জীবনেরই প্রতীক। অসুস্থতা আছে, বিশ্রাম আছে, পুনর্জাগরণ আছে, তারপর আবার নতুন পথচলা। এই কারণেই স্নানযাত্রা একটি উৎসব। কারণ এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ককে নতুন করে অনুভব করার দিন। আর সেই অনুভবই আমাদের শেখায়—দেবত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ অলৌকিকতায় নয়, মানবিকতায়।

জয় জগন্নাথ। 🙏

আরও অবকাশ খবর