টানা ৩ দিন বর্ধমান জেলা সফর শেষে ম্যারাথন বৈঠক, আধিকারিকদের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিনিধি: জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকাঠামো, পরিষেবার মান এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে থাকা খামতি চিহ্নিত করে তা দ্রুত পূরণ করার লক্ষ্যে রবিবার অনুষ্ঠিত হল বিশেষ প্রশাসনিক বৈঠক। বর্ধমান জেলা পরিষদের অঙ্গীকার হলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালগুলিতে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মী নিয়োগ, রোগীদের পরিষেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নি নিরাপত্তা, অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে স্বাস্থ্য আধিকারিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও পরামর্শও চেয়ে নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, শুধু জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেই কাজ শেষ নয়। পরিদর্শনের সময় যে সমস্ত সমস্যা ও ঘাটতি নজরে এসেছে, সেগুলির বাস্তবসম্মত সমাধান করাই এখন মূল লক্ষ্য।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গত চারদিন ধরে পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য দফতর ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন তিনি। আগামী দিনে রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও সফর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘দেখে চলে গেলেই তো হবে না। যে সমস্ত ফাঁক রয়েছে, সেগুলি পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবায় নতুন কিছু ভাবনা যুক্ত করার জন্য সকলের সাজেশন দরকার"। সেই লক্ষ্যেই রবিবারের বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র, বিধায়ক শিশির রায়, জেলাশাসক শ্বেতা আগরওয়াল, পুলিশ সুপার পুষ্পা, প্রিন্সিপাল সব্যসাচী দাস, জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম-সহ জেলার অন্যান্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ও প্রশাসনিক আধিকারিকরা। তবে এই বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার, ও জনস্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ রায়।
হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সাধারণ বর্জ্য নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের প্রায় ৩০ ফুট অন্তর সাধারণ বর্জ্য ফেলার ডাস্টবিন বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হাসপাতাল চত্বরে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমবে এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ, টেকনিশিয়ান, সাফাই কর্মী এবং নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মী ঘাটতি মেটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি ‘লোকাল ফর লোকাল’ পদ্ধতিতে স্থানীয় চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এর ফলে জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্থানীয় চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা ও পরিষেবাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক কর্তারা। জেলায় নার্সিং কর্মীর ঘাটতি মেটানোর বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। নতুন নার্সিং কলেজগুলিকে নার্সিং কর্মী তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য পরিষেবার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষিত নার্সিং কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
CT Scan ও MRI পরিষেবা সম্প্রসারণ
রোগীদের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা দিতে হাসপাতালগুলিতে CT Scan এবং MRI পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়। অত্যাধুনিক রোগ নির্ণয় পরিষেবা আরও সহজলভ্য করার মাধ্যমে জেলার মানুষকে চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালে ছুটতে না হয়, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের মান নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রোগীদের উন্নতমানের খাবার দেওয়ার পাশাপাশি খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে কম্পার্টমেন্ট পদ্ধতি চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে স্টিলের বাসনপত্র ব্যবহারের উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। রোগীদের স্বাস্থ্য ও পরিষেবার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হাসপাতালের খাবার ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত।
জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সদের আবাসন সমস্যার বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। তাঁদের থাকার সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি এবং পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবায় পৃথক ভাড়া কাঠামো
অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার ক্ষেত্রেও নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের জন্য তিন ধরনের পরিষেবার পৃথক ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার ক্ষেত্রে ভাড়ার স্বচ্ছতা বজায় থাকবে এবং রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হয়রানি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হাসপাতালের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। হাসপাতালগুলিতে ফায়ার অডিট করার পাশাপাশি নিয়মিত মক ড্রিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য কর্মীরা যাতে দ্রুত ও সঠিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই নিয়মিত মহড়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে রবিবারের প্রশাসনিক বৈঠকে জেলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও জনমুখী করার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের মাধ্যমে চিহ্নিত সমস্যাগুলির দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য পরিষেবার চাহিদা অনুযায়ী নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য আধিকারিকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবার মান আরও উন্নত করাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য বলে বৈঠক সূত্রে জানা গিয়েছে।

