বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ করছে শুভেন্দু সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদন: লোকসভা ভোটের পর রাজ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এবার দেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও আইনি সংস্কারের পথে হাঁটতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ। উত্তরাখণ্ড, গুজরাত এবং অসমের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবার বাংলাতেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code বা UCC) কার্যকর করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার। নবান্ন সূত্রে খবর, আগামী সোমবার (২৯ জুন) চলতি বাজেট অধিবেশনেই বিধানসভায় বহুচর্চিত ‘ইউসিসি বিল’ (UCC Bill) পেশ করতে চলেছে রাজ্য সরকার। এই বিল পাশ হলে পশ্চিমবঙ্গ হবে দেশের চতুর্থ বিজেপি-শাসিত রাজ্য, যেখানে বলবৎ হবে অভিন্ন দেওয়ানি আইন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজ্য বিধানসভার ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি’ (BA) কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আগামী সোমবার বিলটি পেশ করার বিষয়ে সিলমোহর দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির ইস্তাহার বা ‘সংকল্প পত্রে’ স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হবে। সেই সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই এই বড় ঘোষণা করেছিলেন। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমার অনেকটাই আগে, সরকারের প্রথম একশো দিনের কর্মসূচির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে চলেছে শুভেন্দু সরকার।
কী কী থাকবে বাংলার ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’-তে?
নবান্ন এবং আইন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মূলত সামাজিক সমতা রক্ষা এবং লিঙ্গ-বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যেই এই বিলের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিলের মূল বিষয়গুলি হলো:
এক দেশ, এক আইন: ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে রাজ্যের সমস্ত নাগরিকের জন্য বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তি বন্টন, উত্তরাধিকার এবং সন্তান দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে একই সাধারণ আইন প্রযোজ্য হবে। ভিন্ন ধর্মের জন্য আলাদা কোনও ব্যক্তিগত আইন বা পার্সোনাল ল' থাকবে না
বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ: অসমের ইউসিসি আইনের আদলে পশ্চিমবঙ্গেও বহুবিবাহ বা বহুগামিতা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হতে পারে।
লিভ-ইন সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি: উত্তরাখণ্ডের মতো বাংলাতেও লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নথিভুক্তিকরণ বা রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম চালু হতে পারে।
নারী অধিকার রক্ষা: বিবাহবিচ্ছেদ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীদের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা এই আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
পাহাড় ও জঙ্গলমহলে বিশেষ ছাড়ের ভাবনা?
অসম ও উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যগুলিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার সময় সেখানকার উপজাতি বা জনজাতি (Tribals) সম্প্রদায়কে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল। শতাব্দীপ্রাচীন উপজাতীয় প্রথা ও তাদের সাংবিধানিক অধিকারকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। নবান্ন সূত্রের ইঙ্গিত, পশ্চিমবঙ্গের খসড়া বিলেও পাহাড় (দার্জিলিং-কালিম্পং) এবং জঙ্গলমহলের কিছু বিশেষ আদিবাসী ও জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি-নীতি এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হতে পারে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত রূপরেখা সোমবার বিল পেশের পরই স্পষ্ট হবে।
বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ ও বড় লড়াইয়ের ইঙ্গিত২৯৪ আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বর্তমানে বিজেপির হাতে রয়েছে ২০৭ জনেরও বেশি বিধায়কের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফলে বিধানসভায় এই বিল পাস করিয়ে নিতে শুভেন্দু সরকারের কোনও বেগ পেতে হবে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। অন্য দিকে, প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য দলগুলি গোড়া থেকেই দেশজুড়ে ইউসিসি-র তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। ফলে সোমবার বিলটি পেশ হলে বিধানসভার অন্দরে ও বাইরে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিজেপি যেখানে একে ‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’র অবসান এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বিরোধীরা একে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সব মিলিয়ে, আগামী সপ্তাহেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে।

