তাপপ্রবাহে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে অগ্রাধিকার
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে সংবাদ পরিবেশনকে আরও সহজ, তথ্যভিত্তিক ও মানবকেন্দ্রিক করার আহ্বান জানালেন আবহাওয়াবিদ, চিকিৎসক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, এআই বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ সাংবাদিকরা। শুক্রবার প্রেস ক্লাব, কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘দ্য ফিউচার অব বেঙ্গল: ইমপ্যাক্ট অব হিট অ্যান্ড এক্সট্রিম ওয়েদার’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু সংকটকে কেবল পরিবেশের সমস্যা হিসেবে নয়, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সমাজের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদে প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জীবনসংগ্রামকে গুরুত্ব দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
আসার সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যাডভাইজার্স, এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন মিডিয়া প্রজেক্ট এবং প্রেস ক্লাব, কলকাতার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালায় ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের কলকাতা আঞ্চলিক কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. এইচ. আর. বিশ্বাস সাংবাদিকদের জন্য তাপপ্রবাহ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, সংবাদমাধ্যম নিয়মিতভাবে এই সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিলে বিপর্যয়ের আগে প্রস্তুতির সুযোগ অনেকটাই বাড়বে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আঞ্চলিক আবহাওয়া কেন্দ্রের প্রধান ড. আর. কে. জেনামানিও।
বস্টন-ভিত্তিক ক্লিনিক্যাল গবেষক ও নেফ্রোলজিস্ট ড. প্রতীম সেনগুপ্ত দীর্ঘস্থায়ী তাপ ও আর্দ্রতার কারণে কিডনি, জলশূন্যতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বাড়তে থাকা ঝুঁকির কথা তুলে ধরে বলেন, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমিক, দিনমজুর ও প্রান্তিক মানুষই এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণ—দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
প্রবীণ সাংবাদিক ঋত্বিক মুখোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ‘তথ্যের বাইরে: মানুষ, আখ্যান ও বাংলার জলবায়ুর বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন বোস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক-গবেষক স্বাতী ভট্টাচার্য, জলবায়ু সাংবাদিক জয়ন্ত বসু, প্রেস ক্লাব কলকাতার সভাপতি স্নেহাশিস সুর এবং বিশিষ্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্ট্র্যাটেজিস্ট ড. দীপ্র ভট্টাচার্য।
আলোচনায় ড. দীপ্র ভট্টাচার্য বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল সংকট মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ভারতের ‘মৌসম’ আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা, বজ্রপাতের আগাম সতর্কীকরণে ‘দামিনী’, ভূ-তথ্যভিত্তিক ‘ভুবন’, দুর্যোগ সতর্কীকরণে ‘সচেত’ এবং কৃষি সহায়ক ‘ক্রোপিন’-এর মতো প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই মানুষের জীবন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও জীবিকাকে সুরক্ষিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর মতে, সংবাদমাধ্যমেরও উচিত এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগগুলিকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরা, যাতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জনস্বার্থের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি হয়।
অধ্যাপক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, গবেষক ও সাংবাদিকদের যৌথভাবে কাজ করে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে। জলবায়ু, তাপপ্রবাহ কিংবা বায়ুদূষণের মতো বিষয়কে অর্থনীতি, রাজনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরারও আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনার শেষে বিশেষজ্ঞরা মত দেন, তাপপ্রবাহের আগেই ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের সতর্কবার্তা নিয়মিতভাবে সংবাদে অন্তর্ভুক্ত করা, তাপপ্রবাহকে জনস্বাস্থ্যের জরুরি সংকট হিসেবে তুলে ধরা এবং বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতাকে জলবায়ু প্রতিবেদনের কেন্দ্রে নিয়ে আসাই হবে আগামী দিনের কার্যকর সংবাদ পরিবেশনের অন্যতম ভিত্তি।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য:
স্বাতী ভট্টাচার্য, সাংবাদিক ও গবেষক
"প্রান্তিক মানুষদের বাস্তব অবস্থার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। নারী কৃষকদের অনেকেই আগে সকাল ন'টায় মাঠে নামতেন, এখন প্রচণ্ড গরমের কারণে সকাল ছ'টায় কাজ শুরু করতে বাধ্য হচ্ছেন। আগে যাঁরা পাঁচ বিঘা জমি লিজ নিতেন, এখন তিন বিঘার বেশি নিতে পারছেন না। ফলে তাঁদের আয় কমছে, সন্তানদের ঠিকমতো খাওয়াতে পারছেন না, অপুষ্টির ঝুঁকিও বাড়ছে। নির্মাণক্ষেত্রে প্রায় চল্লিশ শতাংশ শ্রমিকই নারী, কিন্তু বেশি জল খেলেও তাঁদের জন্য পরিষ্কার শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসা প্রতিনিধিদের বড় অংশই নারী, অথচ হাসপাতালের শৌচাগার বা ছায়াযুক্ত জায়গা ব্যবহারের অনুমতিও অনেক ক্ষেত্রে পান না। তাপপ্রবাহের কারণে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির জন্য বিশ্বের কোথাও ক্ষতিপূরণ নেই, আর নারীদের কাজ হারানোর বিষয়টিও এখনও অধিকাংশ তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনায় স্থান পায়নি।"
স্নেহাশিস সুর, সভাপতি, প্রেস ক্লাব কলকাতা
"শুধু রাজনৈতিক সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জলবায়ু ও পরিবেশের সংবাদকেও এমন গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে, যাতে তা প্রথম পাতায় স্থান পায়, আর কখনওই শুধুমাত্র ফাঁকা জায়গা ভরার বিষয় হিসেবে বিবেচিত না হয়।"
জয়ন্ত বসু, জলবায়ু সাংবাদিক
"বিজ্ঞানী ও সাংবাদিকদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এখন যে যোগাযোগ রয়েছে, তা নির্দিষ্ট গবেষণা বা প্রকল্পকেন্দ্রিক। এর বাইরে গিয়ে পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা তৈরি করা জরুরি।"
দীপ্র ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্ট্র্যাটেজিস্ট
'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত এমন এক বুদ্ধিমত্তায় পরিণত হচ্ছে, যা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাপপ্রবাহ, চরম আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নির্ভুল পূর্বাভাস বহু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে, জীবিকা রক্ষা করতে এবং জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে সক্ষম। তবে একই সঙ্গে আমাদের 'সবুজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈপরীত্য'-এর বিষয়টিও মনে রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হবে, সেই প্রযুক্তিকেও শক্তি-সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল হতে হবে। ভবিষ্যৎ সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার, যা শুধু মেধাবী নয়, একই সঙ্গে সবুজ, টেকসই এবং মানবকল্যাণমুখী।"

