খর্বকে বিসর্জন দাও
সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। স্বদেশী যুগে ঋষিকবির সম্যক অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি আজও সমানভাবে ঘটে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, যে গুণ মানুষকে একত্র করে তার মধ্যে একটা প্রধান গুণ বাধ্যতা। কেবলই অন্যকে খাটো করার চেষ্টা , তার ত্রুটি ধরা, নিজেকে কারো চেয়ে ন্যূন মনে না করা, নিজের একটা মত অনাদৃত হলেই অথবা নিজের একটুখানি সুবিধার ব্যাঘাত ঘটলেই দল ছেড়ে আসা, তার বিরুদ্ধাচরণ করার প্রয়াস—এইগুলিই সেই শয়তানের প্রদত্ত বিষ যা মানুষকে বিশ্লিষ্ট করে দেয়, যজ্ঞ নষ্ট করে। ঐক্য রক্ষার জন্য আমাদের অযোগ্যের কর্তৃত্বও স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এর ফলে মহান সংকল্পের কাছে নত হওয়া হয়, অযোগ্যতার কাছে নয়। বাঙালিকে ক্ষুদ্র আত্মাভিমান দমন করে নানারূপে বাধ্যতার চর্চা করতে হবে, নিজে প্রধান হবার চেষ্টা মন থেকে সম্পূর্ণরূপে দূর করে অন্যকে প্রধান করার চেষ্টা করতে হবে। সর্বদাই অন্যকে সন্দেহ করে, অবিশ্বাস করে, উপহাস করে, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় না দিয়ে নম্রভাবে বিনা বাক্যব্যয়ে ঠকবার জন্যও প্রস্তুত হতে হবে। নিজেকে খর্ব করে নিজেকে বড় করার এই সাধনা, খর্ব কে বিসর্জন দিয়ে গৌরবকে আশ্রয় করার এই সাধনা—এটা যখন আমাদের সিদ্ধ হবে তখন আমরা সর্বপ্রকার কর্তৃত্বের যথার্থ যোগ্য হব। অর্থাৎ নিজেকে বড় করার জন্য অন্যকে ছোট করার কোন প্রয়োজন হয় না। একথা মনে রাখতে হবে যে, যথার্থ যোগ্যতাকে পৃথিবীতে কোন শক্তিই প্রতিরোধ করতে পারে না। আমরা যখন কর্তৃত্বের ক্ষমতা লাভ করব তখন আমরা দাসত্ব করব না, তা আমাদের প্রভু যত বড়ই প্রবল হোন। জল যখন জমে কঠিন হয়, তখন সে লোহার পাইপকেও ফাটিয়ে ফেলে। আজ অনেকেই হয়তো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জলের মতো তরল হয়ে আছে কিন্তু জমাট বাঁধার শক্তি জন্মালেই লোহার বাঁধনকে হার মানতেই হবে।

