মানুষের দুটি প্রবণতা
মানবের মধ্যে দুটি প্রবণতা রয়েছে—বিদ্যা আর অবিদ্যা। বিদ্যা নিজেকে প্রকাশ করে— পবিত্রতা অনাসক্তি ঈশ্বর প্রেম ও বিচার বুদ্ধি রূপে। অবিদ্যা, নিজেকে প্রকাশ করে— ভ্রান্তি ক্রুরতা স্বার্থপরতা ইন্দ্রিয়পরায়ণতা প্রভৃতি রূপে। জীবাত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েই এইসব প্রবণতার অস্তিত্ব আর এগুলি পূর্ব পূর্ব জন্মের সঞ্চিত সংস্কারের ফল। এইখানেই এসে পড়ে মানবের দায়িত্ব। সে বিদ্যার বা ধর্মের পথ বেছে নিয়ে ক্রমান্বয়ে ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হতে পারে ও শেষে ঈশ্বরের কৃপায় শুভ-অশুভ দুইয়েরই পারে যায়। অথবা মানব অবিদ্যা বা অধর্মের পথ বেছে নিয়ে ঈশ্বরের থেকে দূরে গিয়ে নিজের উপর ক্রমান্বয়ে দুঃখের ভার চাপাতে থাকে। যদিও ঈশ্বর শুভ ও অশুভ দুয়েরই পারে, তিনি মানব কল্যাণে নিজেকে প্রকাশ করেন মানব রূপে—ঈশ্বরের অবতার রূপে। অবতার মানবকে অধ্যাত্ম সাধনার পথ দেখান এবং প্রায়ই তা হয় এক নতুন পথ যা মানবকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার প্রকৃত আবাসের ও সারতত্ত্বের দিকে, পূর্ণতার দিকে। ঈশ্বর সর্বভূতে সাক্ষী রূপে রয়েছেন। অধ্যাত্মজীবন হল সকল আত্মার আত্মাকে আবিস্কার করা। প্রার্থনা আমাদের ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যায়। প্রার্থনাই আমাদের অন্তর্নিহিত অধ্যাত্ম শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। ঈশ্বর আমাদের প্রার্থনা শোনেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বারবার বলেছেন—প্রার্থনা আন্তরিক হতে হবে। মন ও হৃদয় এক করে প্রার্থনা করতে হবে। ঈশ্বর আমাদের প্রার্থনার উত্তরে যে ব্যবস্থা নেন তাতে আমাদের কল্যাণই হয়। মানুষ প্রায় জানেনা কিসে তার মঙ্গল হবে। কিন্তু মানুষের স্বার্থপর বৈষয়িক প্রার্থনা গুলির কোন ফল তারা একেবারেই পায় না। যদি ঈশ্বর এই ধরনের প্রত্যেকের স্বার্থপর বৈষয়িক ইচ্ছাকে পূরণ করতেন তাহলে জগতে বিশৃঙ্খলাই হত আর যারা শেষ পর্যন্ত জীবিত থাকতো তারা প্রত্যেকেই পাগল হয়ে যেত। আধ্যাত্মিক মানুষ প্রার্থনা করে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে। তার প্রার্থনা হল জীবাত্মার মুক্তির জন্য ব্যাকুলতার প্রকাশ। প্রকৃত ভক্ত প্রার্থনা করার সময় নিজেকে ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে। এ হলো প্রকৃত আলোকের জন্য প্রার্থনা। প্রাচীন হিন্দু প্রার্থনা মন্ত্র গায়ত্রী, যা আজও লক্ষ লক্ষ হিন্দু আবৃত্তি করে থাকে মহত্তম প্রার্থনা গুলির মধ্যে একটি: তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি। ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ।। —'যে দিব্যসত্তা ত্রিলোককে প্রকাশ করেন আমরা তাঁর পরম মহিমার ধ্যান করি। তিনি যেন আমাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগিয়ে দেন।' শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা হল "ধ্যান।" তখন মনের প্রবাহ সম্পূর্ণ নিঃশব্দে ঈশ্বরের দিকে ছুটে চলে।

