সেবার আধ্যাত্মিক রূপ
জগতের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন সাহায্যলাভের জন্য আর্তনাদ করছে। আমাদের সহজাত প্রেরণা থেকেই দুঃখী মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তাদের জন্য বহু মানুষ সদা চিন্তাশীল। অনেকেই সাধ্যমত দাতার ভূমিকা পালন করছেন। খাদ্য বস্ত্র ঔষধ ইত্যাদি দ্বারা অন্তত সাময়িকভাবে কোন বিশেষ কষ্টকে দূর করা অবশ্যই একটি মহৎ কাজ। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত দাতা নিজেকে গ্রহীতা থেকে উচ্চতর বলে জ্ঞান করবেন, ততদিন এই দানের কাজটি শুধুমাত্র আরও অধিকতর অভাবেরই সৃষ্টি করে চলবে। কারণ দাতার দানকার্য গ্রহীতাকে মানসিকভাবে উন্নীত করতে ব্যর্থ হয়। সমাজসেবার প্রতিদানে যদি কোন লাভের বাসনা থাকে তাহলে অবশ্যই হতাশার সঞ্চার হবে। এক্ষেত্রে সেবা সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব ধারণার একটা আমূল পরিবর্তনের বিশেষ প্রয়োজন। বেদান্ত দর্শনের দ্বারা দাতা এবং গ্ৰহীতা উভয়েই উপকৃত হন। গ্ৰহীতা পান স্থূল বস্তু আর দাতা লাভ করেন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। অন্যদের কেন সেবা করব? কারণ উপনিষদ বলে তুমি এবং তোমার প্রতিবেশী হলে একই। ঈশোপনিষদের নবম মন্ত্রে আছে —যে জ্ঞানী ব্যক্তি সকলকে নিজের মধ্যে এবং নিজেকে সকলের মধ্যে দর্শন করেন তিনি কাউকেও ঘৃণা করেন না। অদ্বৈতবেদান্তের শিক্ষনীয় দর্শনটি উপনিষদগুলির মধ্যে অতি সুন্দর ও সহজ সরল ভাবে বিধৃত হয়ে আছে— সর্বব্যাপী সর্বশক্তিমান পরম সত্তা ব্রহ্ম এই বিশ্বের সর্বত্র সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। আমাদের এই পরিদৃশ্যমান জগত ব্রহ্মেরই প্রকাশ আর মানুষই হলো ব্রহ্মের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ, কারণ একমাত্র মানুষই ব্রহ্মের সঙ্গে একত্ব অনুভব করতে সক্ষম। সমাজসেবা এবং ঈশ্বরের আরাধনার মধ্যে সম্পর্কটি স্থাপিত হয় তিনটি স্তরে—কর্ম ও পূজা, পূজারূপে কর্ম এবং কর্মই পূজা। অর্থাৎ কর্মকে সেবা ও পূজারূপে গ্রহণ করবার চেষ্টা করতে হবে। মানুষ এবং ঈশ্বর যে ভিন্ন নয় এই ভাবটিকে সচেতনভাবে সাধনা করতে হবে। যাদের সেবা করছি তাদের মধ্যে জীবন্ত ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করতে হয়। কর্ম বা সেবাই হল পূজা—এই চরম অবস্থাটিই হলো স্বামীজীর সেবাদর্শের চরম ধারণা। সেবাকে একটা আধ্যাত্মিক সাধনারূপে দেখা হয়। পাওয়ার চেয়ে দেওয়া ভালো। এটাই হলো সেবার মুখ্য আদর্শ। পরার্থপরতা অর্থাৎ সর্বদা কোনরূপ প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে পরের ভালো করার চিন্তা ছাড়া আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতি অসম্ভব। সবচেয়ে অধম ব্যক্তি হলো সে, যে সবসময়ই পরের কাছ থেকে নিয়ে নিজের দিকে হাতকে গুটিয়ে নেয়। আর তিনিই হলেন মহত্তম ব্যক্তি যিনি পরের জন্য দান করতে নিজের হাতকে প্রসারিত করে রাখেন। ভগবান সবসময় দানের জন্যই হাতকে সৃষ্টি করেছেন।

