আত্মম্ভরিতার লেজ
সমাজে একদল লোক আছে যারা চিরকাল মতলব খাটিয়ে আসছে, তারা সহজে বিশ্বাস করতে পারে না যে পৃথিবীতে কারো উদারতা আছে। সহজ কথা হলো, সামান্য কাজের মধ্য থেকে একটা ঘোরোতর গূঢ় মতলব করতে এদের বুদ্ধি খুব আমোদ পায়। একটা দুরন্ত অস্থির ছুঁচালো বক্রবুদ্ধি এদের মনের মধ্যে দিনরাত ছটফট করছে, একে তো একটা কাজ দিতে হবে, সহজ কাজে সে খেলাতে পারে না এজন্য সহজের মধ্যেও সে একটা বাঁকা রাস্তা তৈরি করে নেয়। ভালো খেলা খেলবার জায়গা! একজন মানুষ যখন পরের দুঃখ দেখে, দারিদ্র দেখে কেঁদে ওঠে, তখন তার সেই অশ্রু বিন্দু নিয়ে সমালোচনা! একজন সহৃদয় লোক যখন উচ্ছ্বসিত আবেগে প্রাণের কথা বলছে তখন তার সেই কথাগুলিকে বাঁকা ছাঁচে ঢেলে তাদের আকৃতি সম্পূর্ণ বদল করে দেওয়া! এগুলি কেমন হৃদয়হীন খেলা! এর ফলে যে তাদের নিজের হৃদয়ের সর্বনাশ করা হয় সেটা বোঝে না। ফুল মতলব করে সুন্দর হয়েছে, পাখি মতলব করে সুন্দর গাইছে—সবকিছুকে এই ভাবে ভাবা! কিন্তু এই ধরনের বিজ্ঞ লোকেরা নিজেরা কি সুখী? না, তারা প্রাণ খুলে হাসতে পারেনা, প্রাণ খুলে প্রশংসা করতে পারে না, প্রাণ খুলে পরকে বিশ্বাস করতে পারেনা। যদি, কিন্তু, কদাচ, কিঞ্চিৎ প্রভৃতি কথাগুলো ব্যবহার করে কৃপণের দড়িবাঁধা টাকার থলির মুখের মত তাদের ভাষাকে কুঞ্চিত ও সংকুচিত করে তুলছে। আর একেই তারা বিজ্ঞতার লক্ষণ মনে করে। এদের আত্মম্ভরিতার লেজটা খুবই প্রসারিত। এদের শরীরের আয়তন বেশি নয়, কিন্তু লেজ থেকে মাপলে অনেকটা হয়। এদের বিজ্ঞতা সমগ্র জগতকে অবিশ্বাস করে, অবশেষে একটি দুই হাত পরিমাণ ডোবার মধ্যে নিজেকে বদ্ধ করে এবং নিজেকে সমুদ্রের চেয়ে গভীর মনে করে। চন্দ্র সূর্যের হাসিকে চপলতা জ্ঞান করে। এদের অভিজ্ঞতার প্রাণটা একরত্তি, তাকে ছুঁলেই কচ্ছপের মত সে নিজের পেটের মধ্যে প্রবেশ করে। এদের বিজ্ঞতার হাসিতে কৃপণতা, ভাষায় দুর্ভিক্ষ, আলিঙ্গন কাঁকড়ার আলিঙ্গনের মত, এই বিজ্ঞতা নিয়েই তারা গর্ব করে। এই সকল বিজ্ঞ লোকেদের আমরা চিনতে পারবো না, এদের কথা ভালো বুঝতে পারবো না, এরা উপদেশ দেবার সময় বড় বড় নীতি কথা বলে কিন্তু এদের মনে পাপ আছে, এদের সর্বাঙ্গে সংক্রামক রোগ। এরা নিজেরাও পচে অপরকেও পচায়। এরা সমাজের, দেশের ঐক্যের কথা বলে, কিন্তু পাঁচজনকে নিয়েও মিলেমিশে থাকতে পারে না।

