বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

বারান্দার প্রকৃতি দর্শন

প্রকাশিত: ৪ জুন, ২০২৬
বারান্দার প্রকৃতি দর্শন
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

২০২৬ বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ভাবনা : প্রকৃতির অনুপ্রেরণা

 

এবার, ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ভাবনা—“প্রকৃতির অনুপ্রেরণা”—সেটা নিয়ে যখন ভাবি, তখন আমার মনে হয়, আমরা এই অনুপ্রেরণাকে প্রায়ই ভুল জায়গায় খুঁজি। আমরা ভাবি প্রকৃতি আমাদের শেখাবে কীভাবে বাঁচতে হয়। অথচ প্রকৃতি সম্ভবত তার চেয়েও বড় কিছু শেখায়—কেন বাঁচতে হয়।

আমার বারান্দাটা বেশ বড়। দু’পা হেঁটে গেলেই শেষ হয়ে যায় না। একদিকে দেয়াল, অন্যদিকে লোহার গ্রীল। আর সামনের দিকে একটা সবুজে ঘেরা প্রকৃতি। গ্রীলের ওপারে বেশ কিছু পুরোনো গাছ। শহরের ভাষায় একে ‘নেচার ফেসিং’ বলা হয়। রিয়েল এস্টেটের বিজ্ঞাপনে এই শব্দটির বিশেষ কদর আছে। ফ্ল্যাট কেনার সময় আমাকেও বলা হয়েছিল—“আপনার বারান্দা কিন্তু নেচার ফেসিং।”

তখন কথাটা শুনে হেসেছিলাম। প্রকৃতি আবার ফেসিং হয় নাকি? আজ এতদিন পরে মনে হয়, তিনি হয়তো অজান্তেই একটি গভীর সত্য বলে ফেলেছিলেন। সত্যিই তো, আমার এই বারান্দা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতির। আর গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়ে, আমি বুঝতে পেরেছি—মানুষের জীবনে প্রকৃতির উপস্থিতি সবসময় বিশাল আকারে আসে না। কখনও কখনও সে আসে একফালি আকাশ হয়ে, একটি নাম-না-জানা পাখির ডাক হয়ে, কিংবা দুপুরের রোদে হঠাৎ কেঁপে ওঠা একটি পাতার মধ্য দিয়ে।

আমি তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে কাজ করি। পেশাগত জীবনের বড় অংশটাই স্ক্রিনের সামনে কাটে। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলি, অসংখ্য ডেটা দেখি, ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কের ভেতর ঘুরে বেড়াই। কাজের সূত্রে আমি এমন সব জায়গার খবর রাখি, যেখানে হয়তো কোনোদিন যাওয়াই হবে না।

অথচ দিনের শেষে আমি ফিরে আসি এই  দোতলার বারান্দায়।এখানে কোনো পাসওয়ার্ড লাগে না। কোনো লগ-ইন নেই। কোনো নোটিফিকেশন নেই। শুধু সময় আছে, আলো আছে, হাওয়া আছে। আর আছে এক অদ্ভুত নীরবতা। এই নীরবতাকে আগে চিনতাম না। শহরের মানুষ নীরবতাকে প্রায়শই শব্দের অনুপস্থিতি বলে মনে করে। কিন্তু প্রকৃতির নীরবতা আসলে শব্দে ভরা। সেখানে পাতার ঘর্ষণ আছে, দূরের কাকের ডাক আছে, ছাতের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া চিলের ডানার শব্দ আছে, সন্ধেবেলার হাওয়ায়  কার্পাস পাতার ফিসফাস আছে। শুধু মানুষকে একটু থামতে হয়।

ভোরবেলা যখন বারান্দায় আসি, তখন আকাশের দিকে তাকাতে ভালো লাগে। আমার শৈশবের আকাশ এত বড় ছিল না। বাড়ির উঠোন থেকে আয়তাকার আকাশ দেখা যেত। এখন আকাশেরও যেন জমির মত মাপজোক হয়েছে। বহুতল ভবনের মাঝখান দিয়ে যতটুকু দেখা যায়, সেটুকুই যেন আকাশ। তবু আশ্চর্য, আকাশের মহত্ত্ব তার আয়তনের উপর নির্ভর করে না। একফালি আকাশও মানুষকে অনন্তের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।

কখনও কখনও মনে হয়, প্রকৃতির সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার বিনয়। সে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য ব্যস্ত নয়। কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটায়, কিন্তু কাউকে খবর দেয় না। বৃষ্টি নামে, কিন্তু নিজের প্রশংসা করে না। শরতের মেঘ আকাশে ভেসে বেড়ায়, অথচ তার কোনো আত্মপ্রচার নেই। আমরাই কেবল নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এখন আবার সোশাল মিডিয়ায়। 

বারান্দার সামনে যে গ্রীন ভার্জটা আছে, সেটি বছরভর একই রকম থাকে না। গ্রীষ্মে তার সবুজ রঙ-এর ঘনত্ব কমে যায়। বর্ষায় বেড়ে ওঠে। শীতে আবার তার রঙ বদলে যায়। প্রথমদিকে আমি শুধু রঙ দেখতাম। পরে বুঝলাম, আমি আসলে সময়কে দেখছি। প্রকৃতি সময়কে লুকিয়ে রাখে না। একটি শুকনো ডালে নতুন পাতা আসা মানে- সময়। একটি সবুজ পাতার হলুদ হয়ে যাওয়া মানে-  সময়। একটি পাখির বাসা তৈরি করা মানেও সময়। আমরা মানুষ, সময়কে ঘড়িতে মাপি। প্রকৃতি তাকে রূপান্তরে মাপে। সম্ভবত এই কারণেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে এলে মানুষ নিজের বয়স নিয়ে কম চিন্তা করে।

গত শীতে একদিন লক্ষ্য করলাম, একটি শালিক বহুদিন ধরে একই ডালে বসে থাকে। বিকেলের দিকে আসে। কিছুক্ষণ থাকে। তারপর উড়ে যায়। পরদিন আবার আসে।পাখিটিকে দেখে হঠাৎ মনে হতো, পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য কত কম জিনিসই যথেষ্ট! একটা নিরাপদ ডাল। একটু আলো। একফালি আকাশ। মানুষের চাহিদা বাড়তে বাড়তে প্রায় সীমাহীন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এদের সুখের উপাদানগুলো এখনও আশ্চর্য রকমের সরল। এই সরলতার পাঠ আমি কোনো বই থেকে পাইনি। পেয়েছি কিন্তু এই বারান্দায় বসে।

বর্ষাকালে আবার আমার বারান্দা অন্য রকম হয়ে ওঠে। মেঘ জমে। আলো বদলে যায়। দূরের গাছগুলো ধোঁয়াটে হয়ে আসে। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়ার আগের মুহূর্তে বাতাসে যে গন্ধ তৈরি হয়, তাকে আমরা মাটির গন্ধ বলি। কিন্তু আসলে তা কি শুধু মাটির? নাকি তার সঙ্গে মিশে থাকে বহুদিনের স্মৃতি? শৈশবের বিকেল? কাদা মাখা মাঠ? স্কুল ছুটির পর ভিজে বাড়ি ফেরা? আমি জানি না। শুধু জানি, সেই গন্ধ মানুষকে তার নিজের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তাই ভাবি, প্রকৃতির আরেকটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। সে আমাদের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়।

এই দ্রুতগতির পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত ভবিষ্যতের দিকে ছুটছি। আগামী মাস, আগামী বছর, আগামী পদোন্নতি, আগামী লক্ষ্য। কিন্তু প্রকৃতি মাঝে মাঝে কাঁধে হাত রেখে বলে—“একটু পেছনেও তাকাও।” হয়তো সেই কারণেই গাছের দিকে তাকালে আমার ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা বাইরেটা মনে পড়ে। শালিক দেখলে মনে পড়ে  স্কুলের মাঠ। অন্যমনস্ক হয়ে দেখতে থাকা এক বন্ধুকে স্যারের বকুনি। কুয়াশা দেখলে মনে পড়ে শীতের ছুটি। জ্যাঠার বাড়ি, দার্জিলিং।  প্রকৃতি কখনও একা আসে না।সে স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে আসে।

একটি ফুল কেন ফোটে? একটি পাখি কেন ডাকে? একটি নদী কেন বয়ে চলে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো ব্যবহারিক উত্তর নেই। তবু তারা ঘটে। সৌন্দর্যের জন্যই ঘটে। অস্তিত্বের আনন্দে ঘটে। মানুষের জীবনেও কি তেমন কিছু থাকা দরকার নয়? যা শুধুই লাভ-ক্ষতির হিসেবের জন্য নয়? শুধুই বেঁচে থাকার আনন্দে?

সন্ধেটা নামছে। দেবদারু গাছটার ওপর শেষ আলো পড়েছে। গাছটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। কোথাও একটা পাখি ডাকল। দূরে একটি জানলায় আলো জ্বলে উঠল। আমি বারান্দায় চা নিয়ে এসে বসলাম। হাতে কোনো মোবাইল নেই। সামনে কোনো স্ক্রিন নেই। শুধু একটি দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এবং সেই শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যেও কোনো বিষাদ নেই। কারণ প্রকৃতি জানে, সমাপ্তি বলে কিছু নেই। আছে শুধু পরিবর্তন।

রাত আসবে। আবার ভোর হবে। পাতা ঝরবে। আবার পাতা গজাবে। সেরকমই মানুষ যাবে। নতুন মানুষ আসবে। এই অন্তহীন চক্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্রতাকে অনুভব করা যায়, আবার নিজের অস্তিত্বের মূল্যও বোঝা যায়। সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এখানেই। সে আমাদের সম্পূর্ণ হতে শেখায়। আর সেই শিক্ষা, বিস্ময়করভাবে, আমি কোনো অরণ্যে নয়, কোনো পাহাড়চূড়ায় নয়—আমার আবাসনের  বারান্দাতেই পেয়ে গেছি।

আজকাল তাই মনে হয়, প্রকৃতি কোথাও দূরে নেই। সে সন্ধেবেলার আলো হয়ে আমার বারান্দায় এসে বসে, হাওয়া হয়ে কাঁধে হাত রাখে, আর নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে এখনও সব সুন্দর শেষ হয়ে যায়নি। তাই অরণ্যে যাওয়ার সাধ থাকলেও আফসোস নেই। এই বারান্দায় দাঁড়িয়েও আমি প্রতিদিন একটু করে প্রকৃতির গন্ধ পাই, আর নিজের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকেও খুঁজে পেতে চেষ্টা করি।