হট টপিক
স্বাদে অতুলনীয় কামারপুকুরের সাদা বোঁদে
প্রকাশিত: ১ জুন, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ বাংলার মিষ্টির ইতিহাসে এক অনন্য ও ঐতিহ্যবাহী নাম হলো হুগলি জেলার কামারপুকুরের বিখ্যাত সাদা বোঁদে। সাধারণত যেকোনো মিষ্টির দোকানে বোঁদে বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে লাল কিংবা হলুদের মিশ্রণ। কিন্তু কামারপুকুরের মিষ্টি কারিগরেরা বোঁদেকে সম্পূর্ণ 'বেরঙিন' বা শ্বেতশুভ্র রূপ দিয়েও স্বাদে এনেছেন এক অবিশ্বাস্য জাদু। সম্প্রতি বিশ্ব দরবারে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির মুকুটে জুড়েছে এক নতুন পালক। ঐতিহ্য এবং গুণমানের নিরিখে কামারপুকুরের এই সাদা বোঁদে সগর্বে লাভ করেছে ভৌগোলিক স্বীকৃতি বা জিআই ট্যাগ (GI Tag)।
শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদাদেবীর প্রিয় মিষ্টি
কামারপুকুরের সাদা বোঁদের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো। এই মিষ্টির বিশ্বজোড়া খ্যাতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে যুগপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং শ্রীশ্রী সারদা মায়ের নাম। লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী এবং ‘শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, গদাধর তথা বালক রামকৃষ্ণ এই সাদা বোঁদে খেতে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। কামারপুকুরের মোদক পরিবারের আদিপুরুষ মধুসূদন মোদকের দোকান থেকেই ছোট্ট গদাই এই মিষ্টি খেতেন। রামকৃষ্ণদেবের সূত্রেই পরবর্তীকালে সারদা মায়েরও অত্যন্ত প্রিয় মিষ্টি হয়ে ওঠে এটি। বর্তমানে দেশ-বিদেশ থেকে যে সমস্ত ভক্ত ও পর্যটকরা কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠে আসেন, তাঁরা প্রসাদ হিসেবে এই সাদা বোঁদে কিনতে কখনই ভুল করেন না।
তৈরির অনন্য উপাদান ও রন্ধনশৈলী
সাধারণ বোঁদে মূলত ছোলার বেসন দিয়ে তৈরি হলেও, কামারপুকুরের সাদা বোঁদে তৈরির পদ্ধতি এবং উপাদান সম্পূর্ণ আলাদা। কারিগরদের মতে, এই মিষ্টির প্রধান উপাদান হলো রমা কলাই বা রম্ভা কলাইয়ের (বরবটির বীজ) বেসন এবং আতপ চালের গুঁড়ো। সাধারণত ২:১ অনুপাতে আতপ চালের গুঁড়ো ও রমা কলাইয়ের ডাল মিশিয়ে একটি নিখুঁত মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর ছাঁকনি বা ছাঁনচার সাহায্যে সেই মিশ্রণ গরম ঘিয়ে ভেজে নেওয়া হয়। ভাজার পর সেগুলিকে চিনির হালকা রসে ডুবিয়ে রস ঝরিয়ে শুকিয়ে নেওয়া হয়। যেহেতু এটি ড্রাই বা শুকনো প্রকৃতির হয়, তাই সাধারণ মিষ্টির তুলনায় এটি অনেক দিন পর্যন্ত ভালো ও সতেজ থাকে।
বিপুল চাহিদা
কামারপুকুর এবং তার আশেপাশের এলাকায় বর্তমানে প্রতিদিন কুইন্টাল কুইন্টাল সাদা বোঁদে তৈরি হয়। বিশেষ করে শীতকালে যখন পর্যটকদের ভিড় উপচে পড়ে, তখন এই বোঁদের চাহিদা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। বর্তমান বাজারে অত্যন্ত সস্তা ও সাধ্যের মধ্যে মিললেও এর রাজকীয় স্বাদ ভোজনরসিকদের বারবার কামারপুকুরে টেনে আনে। জিআই স্বীকৃতি মেলার পর এই কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় ময়রা ও ব্যবসায়ীদের মুখে চওড়া হাসি ফুটেছে। এই স্বীকৃতি যেমন মিষ্টির গুণমানকে বিশ্বস্ত করেছে, তেমনই আগামী দিনে এই মিষ্টির বাণিজ্যিক প্রসার ঘটিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও মজবুত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

