বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

বিবেকানন্দ, বেলুড় মঠ ও শ্রীরামকৃষ্ণ বিগ্রহ

প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬
বিবেকানন্দ, বেলুড় মঠ ও শ্রীরামকৃষ্ণ বিগ্রহ
সুদীপ পালসুদীপ পাল
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

পর্ব – ২ 


বেলুড় মঠে জমি কেনার পর ১৮৯৮ সালে স্বামীজী গুরুভ্রাতা স্বামী বিজ্ঞানানন্দকে (তখন ব্রহ্মচারী বিজ্ঞানানন্দ, পূর্বনাম হরিপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, কৃতি ইঞ্জিনিয়ার) মঠের জমিতে ভাবী মন্দিরের জন্য স্থান চিহ্নিত করেন। একইসাথে মন্দিরের গঠন কৌশল এবং শৈল্পিক কারুকার্য সম্পর্কে সবিস্তার ব্যাখা করেন। ‘স্বামী-শিষ্য-সংবাদ’ গ্রন্থে দেখা যায় স্বামীজী মন্দিরের শৈল্পিক কারুকার্য সম্পর্কে বলছেন, ‘বহুসংখ্যক জড়িত স্তম্ভের ওপর একটি প্রকান্ড নাটমন্দির হবে। তার দেওয়ালে শত-সহস্র প্রফুল্ল-কমল ফুটে থাকবে। হাজার হাজার লোক যাতে একত্রে বসে ধ্যানজপ করতে পারে, নাটমন্দির এমন বড় করে নির্মাণ করতে হবে। আর শ্রীরামকৃষ্ণ-মন্দির ও নাটমন্দির এমনভাবে একত্র গড়ে তুলতে হবে যে, দূর থেকে দেখলে ঠিক “ওঙ্কার” বলে ধারণা হবে। মন্দির-মধ্যে একটি রাজহংসের ওপর ঠাকুরের মূর্তি থাকবে।’ নতুন মন্দির নিয়ে স্বামীজী একদিকে যখন মন্দিরের গঠন এবং বিন্যাস নিয়ে উচ্ছ্বসিত অন্যদিকে নিজের দেহাবসান নিয়েও অত্যন্ত সচেতন। বিবেকানন্দের চরিত্রে এই পর্বে যেন তাঁর দুটি স্বত্ত্বা সমান্তরাল ভাবে বয়ে চলেছে। প্রথম স্বত্ত্বাটিতে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় শিষ্য, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাছে ‘L-O-V-E Personified’। অন্য স্বত্ত্বাটি কপর্দকশূন্য সন্ন্যাসী, সপ্তর্ষির ঋষি। যাঁর মন নিজ নিকেতনে ফেরার জন্য ব্যাকুল। তাই দেখা যায় মন্দিরের নকশার বর্ণনা করতে করতে শিষ্য বিজ্ঞানানন্দকে বলছেন, মন্দির যখন সম্পূর্ণ হবে ‘এ-দেহটা ততদিন থাকবে না, তবে আমি উপর থেকে দেখব।’
১৯০২ সালে স্বামীজীর দেহাবসানের প্রায় পঁচিশ বছর পর ১৯২৯ সালে ১৩ মার্চ শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথিতে স্বামী শিবানন্দজী শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের শিলান্যাস করেন। কিন্তু পূর্ণ মন্দির নির্মান তখন সম্ভব হয়নি। তার মূল কারণ আর্থিক প্রতিবন্ধকতা। ১৯৩৪ সালে প্রভিডেন্স-এর বেদান্ত সোসাইটি বেলুড় মঠে জানায় মিস হেলেন এফ রুবেল মন্দির নির্মাণের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তার অধিকাংশ দেবেন। কিন্তু ততদিনে স্বামী শিবানন্দজী ইহলোক ত্যাগ করেছেন। ফলে প্রশ্ন উঠল কে নেবেন এই গুরুদায়িত্ব? আবারও এগিয়ে এলেন বিজ্ঞানানন্দ। শিবানন্দজী মন্দিরের শিলান্যাস করে গিয়েছিলেন। কিন্তু মঠের যে জায়গা মন্দির নির্মাণের জন্য চিহ্নিত হয়েছিল তার পরিবর্তন ঘটল। তাই ফের ১৯৩৫ সালে ১৬ জুলাই গুরুপূর্ণিমার দিন নতুন স্থানে তাম্রফলক স্থাপন করলেন বিজ্ঞানানন্দজী। আর্থিক প্রতিবন্ধকতা কেটে গিয়ে মার্টিন অ্যান্ড বার্ন কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার গোপেন্দ্রকৃষ্ণ সরকারের তত্ত্বাবধানে শুরু হল মন্দির নির্মাণের কাজ। মন্দিরের কাজ শুরু হলেও ফের সমস্যায় পড়লেন সন্ন্যাসীরা। মন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তি থাকবে। কিন্তু কে হবেন ভাস্কর?
শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তিগড়ার জন্য ভাস্করের সন্ধান শুরু হল। কিছুতেই মনের মতো ভাস্কর মেলে না। মঠের তরফ থেকে একাধিক ভাস্করকে শ্রীরামকৃষ্ণ মূর্তির মডেল গড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু কোনটিই পছন্দ হয়নি সন্ন্যাসীদের। অবশেষে বাগবাজারের পশুপতি বসুর পুত্র কালী বসু মঠের সন্ন্যাসীদের নিয়ে হাজির হলেন গোপেশ্বর পালের কাছে। গোপেশ্বর পাল ছিলেন সেই যুগের বিখ্যাত ভাস্করশিল্পী। বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল গোপেশ্বর পালের শিল্পকলায় মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ এম্পায়ার একজিবিশনে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। সন্ন্যাসীদের কথোকথনের পর গোপেশ্বর, শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধিস্থ হয়ে যাওয়া যে ছবির অনুসরণে তৈরি হবে মূর্তি তার একটি এনলার্জমেন্ট পাঠানোর অনুরোধ করেন। গোপেশ্বরকে প্রাথমিক পারিশ্রমিক নেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তিনি রাজি হননি। শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি দেখে মডেল তৈরি হবে। সেই মডেল যদি পছন্দ হয় তখনই মূর্তিগড়ার পাকা কথা হবে বলে জানান তিনি। সন্ন্যাসীদের পাঠানো ছবি এবং তিনি নিজের উদ্যোগে শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি জোগাড় করে শুরু করলেন মূর্তির মডেল তৈরির কাজ। নির্দিষ্ট দিনে মডেল দেখতে এসে ভারী পছন্দ হল সন্ন্যাসীদের। এবার শুরু হল আসল মূর্তির কাজ। ইটালিয়ান শ্বেতপাথর খোদাই শুরু করলেন গোপেশ্বর। যে মূর্তি দেখে শুধুমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তরা বিহ্বলিত হবেন এমন নয়, ভাবীকালের নাস্তিক মানুষও অনুভূতিবান আচার্যের ভূমিকায় যাতে উপনীত হতে পারেন সেই মূর্তি গড়ার কাজ শুরু করেছেন গোপেশ্বর। দক্ষিণেশ্বরে বিষ্ণুমন্দিরের বারান্দায় সমাধিমগ্ন অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণের যে ছবিটি তোলা হয়েছিল তারই অবিকল রূপ ইটালিয়ান শ্বেতপাথরে ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হলেন গোপেশ্বর।
নির্দিষ্ট দিনে সমাপ্ত হল মন্দির নির্মাণ ও মূর্তিগড়ার কাজ। অতঃপর ১৯৩৮ সালের ১৪ জানুয়ারি, বাংলার ১৩৪৪ সালে ৩০ পৌষ মকর সংক্রান্তির দিন স্থায়ী মঠের স্থায়ী মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হল। দ্বারোদ্ঘাটন করলেন বিজ্ঞানানন্দজী। এই শুভ অনুষ্ঠানে মন্দির নির্মাণের সময় যাঁরা অর্থ সাহায্য করেছিলেন সেই মিস হেলেন এফ রুবেল এবং মিস অ্যানা উর্স্টার সুদূর আমেরিকা থেকে এসেছিলেন। তৎকালীন সময়ে প্রায় ছয় লক্ষ টাকা তাঁরা এই নির্মাণ কাজে প্রণামী দিয়েছিলেন।   
স্থায়ী মঠের স্থায়ী এই মন্দিরে জড়িয়ে আছেন আর এক বিখ্যাত শিল্পী। তিনি শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু। শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধিস্থ মূর্তিটি ভারতের প্রাচীন ভাস্কর্যধারা অনুসরণ করে প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর রাখা হয়েছে। নন্দলাল বসু মূর্তির বেদি ও চন্দ্রাতপের নকশা করেছিলেন ডমরু আকৃতির, চতুস্কোণ। বেদির সম্মুখে উৎকীর্ণ হংস, তার ওপর প্রস্ফুটিত পদ্ম।
৩০ পৌষ ‘আত্মারামের কৌটা’ স্থাপন করা হল বেদির ওপর। পূজা সম্পূর্ণ করে বিজ্ঞানানন্দজী ফিরে এলেন নিজের কক্ষে। বললেন, ‘স্বামীজীকে বললাম, স্বামীজী, আপনি উপর হতে দেখবেন বলেছিলেন, আজ দেখুন, আপনারই প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর নূতন মন্দিরে বসেছেন।……এবার আমার কাজ শেষ হল। স্বামীজী আমার উপর যে-কাজের ভার দিয়েছিলেন, সে-ভার আজ আমার মাথা থেকে নেমে গেল।’
চলবে……