ক্রিয়াযোগ বিজ্ঞান
যোগের সর্বপ্রধান ব্যাখ্যাতা মহর্ষি পতঞ্জলি ক্রিয়াযোগের বিষয়ে বলেছেন, ক্রিয়াযোগ হচ্ছে শরীরনিষ্ঠা, মানসিক সংযম, আর প্রণবধ্যান। তিনি ব্রহ্মকে নাদরূপে বর্ণনা করে গেছেন, ধ্যানে যা শোনা যায়। এই ওঙ্কারধ্বনিই সৃষ্টির আদিমূল, এর ঝঙ্কারই হচ্ছে শক্তিকেন্দ্রের স্পন্দনধ্বনি, ঈশ্বর অস্তিত্বের সাক্ষ্য। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবিচ্ছেদ করে যে প্রাণায়াম সাধিত হয়, তাতেই মুক্তিলাভ ঘটে। স্বামী পরমহংস যোগানন্দ বলেছেন, কতকগুলি ভ্রান্ত হাতুড়ে গোছের লোকেদের দ্বারা প্রদত্ত অবৈজ্ঞানিক শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধের প্রণালীর সঙ্গে ক্রিয়াযোগের কোন সামঞ্জস্য নেই। জোর করে ফুসফুসের মধ্যে বায়ু পুরে রাখবার চেষ্টা শুধু যে অস্বাভাবিক তা নয়, অত্যন্ত অস্বস্তিকরও বটে। প্রাচীন যৌগিকক্রিয়া শ্বাস-প্রশ্বাসকে মানস সত্তায় রূপান্তরিত করে। আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সাধক শ্বাস-প্রশ্বাসকে মনেরই ক্রিয়া, একটা মানসিক ধারণা বলে জানতে পারেন। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি এবং তার চেতনা বা বাহ্য জ্ঞানের অবস্থার তারতম্যের মধ্যে একটা গাণিতিক সম্বন্ধে আছে। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোন মানুষের প্রগাঢ় মনঃসংযোগের সময় অথবা কোন কঠিন, দুঃসাধ্য বা বিপজ্জনক শারীরিক ব্যায়ামকৌশল প্রদর্শনের সময় তার শ্বাস-প্রশ্বাস আপনা-আপনিই অতি ধীরে ধীরে চলে। মনঃসংযোগের প্রগাঢ়ত্বও ধীর শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর নির্ভর করে। খুব দ্রুত অথবা অসমান নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ভয়, কাম, ক্রোধ প্রভৃতি ক্ষতিকর ভাবাবেগ থেকে জন্মায়। অস্থির বানরের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি মিনিটে ৩২ বার ; সে ক্ষেত্রে মানুষের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি মিনিটে ১৮ বার। হাতি, কচ্ছপ, সাপ প্রভৃতি কয়েকটি প্রাণী যাদের আয়ু বেশি, তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস মানুষের চেয়েও কম। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, মহাকূর্ম, যারা ৩০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে, তারা মিনিটে কেবলমাত্র ৪ বার নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ঘুমের যে ক্লান্তি অপনোদনকারী সঞ্জীবনী শক্তি আছে, তার কারণ মানুষ সাময়িক তার শরীর আর শ্বাস-প্রশ্বাসের কথা ভুলে যায়। ঘুমন্ত মানুষ একজন যোগীই হয়ে যায়। প্রতি রাত্রেই নিজের অজ্ঞাতসারে মানুষ নিজেকে দেহাত্মবোধ থেকে মুক্ত করার যৌগিক প্রক্রিয়া সাধনা করে, আর তার প্রাণশক্তি প্রবাহকে মস্তিষ্কের প্রধানস্থল ও মেরুদন্ডের ছয়টি চক্রস্থিত শক্তি-উৎসের সঙ্গে মিলিত করে। ঘুমন্ত মানুষ এইভাবে নিজের অজ্ঞাতসারে বিশ্বশক্তির দ্বারা প্রতিপূরিত হয়, যা সকল জীবন বাঁচিয়ে রাখার আশ্রয়স্থল। তফাৎ হলো, সাধক সাধারণ মানুষের মতো না জেনে নয়, জেনেই একটি সহজ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সাধনা করেন। সাধনার দ্বারা বৈজ্ঞানিক উপায়ে শ্বাস-প্রশ্বাসকে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় করে তোলেন সাধক। ফলে সাধন কালে তাঁকে আর নিদ্রা, চৈতন্য বা মৃত্যুর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় প্রবেশ করতে হয় না।

