চরৈবেতি চরৈবেতি
ঘুমিয়ে থাকাটাই হল কলিকাল। জাগলেই দ্বাপর। উঠে দাঁড়ালেই ত্রেতা। এগিয়ে চলাই হল সত্যযুগ। অতএব চরৈবেতি চরৈবেতি। এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো। এই চরৈবেতির দীপ্তবাণী ভারতের বুকে উচ্চারিত হয়েছে হাজার হাজার বছর আগে। ভারত অন্যান্য জাতির মত অর্থ ও কামকে জীবনের লক্ষ্য করেনি। তাই বলে অর্থ ও কামকে অস্বীকারও করেনি। উপমা হিসাবে বলা যায়, একটা নদীর কথা। নদীর এপার ধর্ম ওপার মোক্ষ। মাঝখানে যে প্রবাহ—তা হচ্ছে অর্থ ও কাম। ভারতীয় জীবন শুরু হয় ধর্ম থেকে এবং শেষ হয় মোক্ষে। সে ইচ্ছা করলে অর্থ-কামরূপ প্রবৃত্তিমার্গের ভিতর দিয়ে অর্থ-কামকে অস্বীকার করে দ্রুত মোক্ষে পৌঁছতে পারে। সকলেরই এক রাস্তা—এটি কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলে না। ভারত-সংস্কৃতি এই সমস্যার সমাধান করেছে কর্মবাদ ও জন্মান্তরবাদ দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ইউরোপ কর্মকেই একমাত্র লক্ষ্য করেছে। কিন্তু ভারতবর্ষ কর্ম থেকে স্বাধীনতা চেয়েছে। আমাদের সংসারে কর্মই বস্তুত কর্তা, মানুষ তার বাহনমাত্র। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা এক বাসনার পরে আর এক বাসনাকে, এক কর্ম থেকে আর এক কর্মকে বহন করে চলি। হাঁফ ছাড়বার সময় পাইনা। তারপর সেই কর্মের ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে হঠাৎ মৃত্যুর মধ্যে সরে পড়ি। এই যে বাসনার তাড়নায় চিরজীবন অন্তবিহীন কর্ম করে যাওয়া—ভারতবর্ষ এর দাসত্ব উচ্ছেদ করতে চেয়েছে। ভারতবর্ষের পুরুষেরা যদি ভারতের সংস্কৃতির জয়গান করেন আমরা তা তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখি। কিন্তু কোন বিদেশি মনীষী যদি ভারতের মহিমা জ্ঞাপন করেন তবে তা আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করি। শত শত বছরের দাসত্বের এই হল শোচনীয় পরিনাম! "ন কর্মণা : ন প্রজয়া ধনেন ত্যাগনৈকে অমৃতত্বমানশুঃ।" অর্থাৎ কর্ম, সন্তান বা ধনের দ্বারা নহে, একমাত্র ত্যাগের বিনিময়ে মানুষ অমৃতত্ব লাভ করে। এই চৈতন্য অভিমুখী দৃষ্টি ভারতীয় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদি ভারত জড়ের, জাগতিক ঐশ্বর্যের জন্য চেষ্টা করত তবে তার সংস্কৃতি পৃথিবীর অন্যান্য সংস্কৃতির মত বিলীন হত অথবা ইতিহাসের পাতায় অতীতের সাক্ষী হয়ে থাকতো। ভারত চিরকাল সম্যকরূপে কৃতির বা কাজের ভিতর দিয়ে মনুষ্যত্বের সাধনায় রত। এটাই ভারতীয় সংস্কৃতি।

