প্রচলিত শিক্ষার বাইরে
আমরা ধর্মোপদেশ অনেক পেয়েছি এবং পাচ্ছি কিন্তু তা গ্ৰহণ করার উপযোগী মনোভাব এবং মানসিক প্রস্তুতি আমাদের নেই বলে এতো ধর্মোপদেশ শুনেও কোন কাজ হচ্ছে না। যীশুখ্রীষ্ট একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন —এক চাষি জমিতে বীজ ছড়ানোর সময় কতকগুলি বীজ বাইরে পড়েছে এবং সেগুলি পাখি খেয়ে গেল। কিছু বীজ ঘাসের উপরে পড়েছে, সেগুলি আগাছার চাপে নষ্ট হলো। কতকগুলি পাথরের উপর পড়ে শুকিয়ে গেল। আর কিছু বীজ পড়েছে কর্ষিত ক্ষেত্রে, সেখানে ফসল ফলল। সুতরাং এথেকে বোঝা গেল তত্ত্বজ্ঞান গ্ৰহণের অনুপযোগী বা পরিপন্থীরূপে নানা রকমের যে উপদ্রব আছে, প্রথমে সেগুলি দূর করতে না পারলে তত্ত্ব জীবনে প্রতিফলিত হবে না। ধর্মোপদেশ শুধু শুনলেই হবে না। মনের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া তত্ত্বকথা শুনে কিছু হয় না। শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে শুশ্রূষু নয়, বিনয়ী নয়, সেবাপরায়ণ নয়, তাকে এ জ্ঞানের কথা বলা ঠিক নয়। বিনয়ী হলে তবেই একজনের মধ্যে গ্ৰহণ করার মনোবৃত্তি থাকবে। সেবাপরায়ণ হলে তবেই গুরুকৃপা লাভের সামর্থ্য তৈরি হবে। পরা বিদ্যা বা অধ্যাত্মবিদ্যা গ্ৰহণের জন্য এইগুণ গুলির একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু অপরা বিদ্যা বা সাধারণ বিদ্যা শিক্ষালাভের জন্য মাসিক বেতন দিয়ে শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করা যায়। এরজন্য সেবাপরায়ণ হতে হয় না। কিন্তু প্রকৃত মানুষ হবার শিক্ষা, নৈতিক ও মূল্যবোধ সম্পন্ন চরিত্র গঠনের শিক্ষার জন্য ঐ গুণগুলি থাকা আবশ্যক। সাধারণভাবে শিক্ষার উদ্দেশ্য একটা চাকরি পাওয়া বা স্বনির্ভর হওয়া। সহজ, সচ্ছল জীবনযাত্রা হবে এবং ভোগের যাবতীয় দ্রব্য (অত্যাধুনিক) সহজলভ্য হবে— এটাই বেশিরভাগ মানুষের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে চরিত্র গঠন, মূল্যবোধের বিকাশ এসবের গুরুত্ব থাকে না। অথচ আমাদের জন্য প্রকৃত জ্ঞান ভান্ডার উন্মুক্ত হয়েই আছে আমাদের শাস্ত্রগুলিতে, উপনিষদে। কিন্তু আমরা তা গ্ৰহণ করার উপযোগী হয়ে উঠছি না। কারণ আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় সে সুযোগ নেই। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে আমাদের এই শিক্ষালাভ করতে হবে। বলা হয়, স্বয়ং ব্রহ্মা তত্ত্বজ্ঞান দেওয়ার আগে ইন্দ্রকে দীর্ঘকাল ব্রহ্মচর্য পালন করিয়েছিলেন অধিকারী করার জন্য।

