সম্মুখে বৃহৎ মৃত্যু
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, সৈন্যদল যখন রণক্ষেত্রে যাত্রা করে তখন যদি পাশের গলি থেকে তাদেরকে কেউ গালি দেয় বা গায়ে ঢিল ছুঁড়ে মারে তবে তখনই ছত্রভঙ্গ হয়ে অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য তারা পাশের গলিতে ছুটে যায় না। এই অপমান তাদেরকে স্পর্শ করতে পারে না, কারণ তাদের সম্মুখে বৃহৎ সংগ্রাম, তাদের সম্মুখে মহৎ মৃত্যু। তেমনি যদি আমরা যথার্থভাবে আমাদের এই বৃহৎ দেশের কাজ করার দিকে যাত্রা করি তবে তারই মাহাত্ম্যে ছোটবড় বহুতর বিক্ষোভ আমাদের স্পর্শই করতে পারেনা। কিন্তু আমাদের দেশে সম্প্রতি যে সকল আন্দোলন আলোচনার ঢেউ উঠেছে তার মধ্যে অনেকটা আছে কলহমাত্র। নিঃসন্দেহে দেশবৎসল লোকেরা এই কলহের জন্য অন্তরে অন্তরে লজ্জা অনুভব করছেন। কারণ কলহ অক্ষমের উত্তেজনাপ্রকাশ, তা অকর্মণ্যের একপ্রকার আত্মবিনোদন। সর্বনাশের সম্মুখে দাঁড়িয়ে কারো কি অভিমান মনে আসে, মৃত্যুশয্যার শিয়রে বসে কারো কি কলহ করার প্রবৃত্তি হতে পারে? ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাত্র অষ্টাদশ বছরের কিশোর যা ভেবেছিল আমরা কি তার মূল্য দিতে পেরেছি? ১৯০৮ সালের এপ্রিল মাসে মজঃফরপুর জেলা জজ কিংসফোর্ডের গাড়িতে বোমা নিক্ষিপ্ত হলে জজ সাহেবের পরিবর্তে দুজন মেম সাহেব নিহত হন। এই কিংসফোর্ড সাহেব কলকাতায় প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে স্বদেশী আন্দোলনকারীদের উৎপীড়ন করে কুখ্যাত হয়েছিলেন। জনসাধারণের বিরাগভাজন হওয়ায় তাকে বদলি করা হয় মজঃফরপুর জেলায়। কলকাতা থেকে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল কুমার চাকী তার উপর বোমা নিক্ষেপ করতে যায়। পরে ধরা পড়ে কিশোর বয়স্ক ক্ষুদিরাম ফাঁসিতে জীবন দান করেন। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরামের আত্মদান বাংলার পল্লীগীতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে— একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। মজঃফরপুরে বোমার আওয়াজে সমস্ত ভারত প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ইংরেজ ভীতি কমে যায়। প্রফুল্ল চাকী গ্রেপ্তারের পূর্বক্ষণে পরপর তিনটি রিভলবারের গুলি নিজের দেহে ছুঁড়ে আত্মহত্যা করে শত্রুর স্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত করেন। ১৯০৮ সালের ১১ই আগস্ট ক্ষুদিরামকে ফাঁসি দেওয়া হয়। হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন ক্ষুদিরাম। সেই সময় ক্ষুদিরামের হাজার হাজার ছবি বাঙালির ঘরে ঘরে শোভা বর্ধন করে আর কিশোর যুবকদের অনুপ্রাণিত করে দেশের মুক্তি সংগ্রামের সৈনিক হিসাবে লড়াই চালাতে। দেশের মুক্তি সংগ্রামে যাঁরা জীবন বলি দিলেন তাঁদের আত্মত্যাগের কথা আমরা কয়জনই বা মনে রাখি!

