কীর্তির্যস্য স জীবতি
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলছেন, যিনি ক্ষমতাপন্ন লোক তিনি নিজের কীর্তির মধ্যেই নিজে বেঁচে থাকেন। তিনি যদি নিজেকে বাঁচাতে না পারেন, তবে তাঁকে বাঁচাবার চেষ্টা আমরা করলে তা হাস্যকর হয়। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন সম্পর্কে কবিগুরু লিখছেন, বঙ্কিমকে কি আমরা স্বহস্তরচিত পাথরের মূর্তি দ্বারা অমরত্বলাভ করতে সহায়তা করব? আমাদের চেয়ে তাঁর ক্ষমতা কি অধিক ছিল না? তিনি কি নিজের কীর্তিকে স্থায়ী করে যাননি? হিমালয়কে স্মরণ রাখবার জন্য কি চাঁদা তুলে তার একটা কীর্তিস্তম্ভ স্থাপন করার প্রয়োজন আছে? হিমালয়কে দর্শন করতে গেলেই তার দেখা পাব, অন্যত্র তাকে স্মরণ করার উপায় করতে যাওয়া মূঢ়তা। কৃত্তিবাসের জন্মস্থানে বাঙালি একটা কোনপ্রকারের ধুমধাম করেনি বলে বাঙালি কৃত্তিবাসকে অবজ্ঞা করেছে একথা কেমন করে বলবো? যেমন 'গঙ্গা পূজি গঙ্গা জলে', তেমনি বাংলাদেশে মুদির দোকান থেকে রাজার প্রাসাদ পর্যন্ত কৃত্তিবাসের কীর্তিদ্বারাই তিনি কত শতাব্দী ধরে প্রতিদিন পূজিত হয়ে আসছেন। এমন প্রত্যক্ষ পূজা আর কিসে হতে পারে? আমাদের দেশে আধুনিক কালের বারোয়ারির শোকের মধ্যে বারোয়ারির স্মৃতিপালন চেষ্টার মধ্যে গভীর শূন্যতা দেখে আমরা পদে পদে ক্ষুব্ধ হই—একথা বলছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি আরও বলছেন, নিজের দেবতাকে কোন্ প্রাণে এমন কৃত্রিম সভায় উপস্থিত করে পূজার অভিনয় করা হয় বুঝতে পারিনা। সেই অভিনয়ের আয়োজনে যদি মাল-মসলা কিছু কম হয় তবে আমরা পরস্পরকে লজ্জা দিই, কিন্তু লজ্জার বিষয় গোড়াতেই। যিনি ভক্ত তিনি মহতের মাহাত্ম্য কীর্তন করবেন এটা স্বাভাবিক এবং সকলের পক্ষেই শুভফলপ্রদ, কিন্তু মহাত্মাকে নিয়ে সকলে মিলে একদিন বারোয়ারির কোলাহল তুলে কর্তব্য সমাধার চেষ্টা লজ্জাকর এবং নিষ্ফল। বিদ্যাসাগর আমাদের সমাজে ভক্তিলাভ করেননি এ কথা কোনমতেই বলা যায় না। তাঁর প্রতি বাঙালিমাত্রেরই ভক্তি অকৃত্রিম। কিন্তু যারা প্রতিবছর বিদ্যাসাগরের স্মরণ সভা আহবান করেন তাঁরা আক্ষেপ করে বলেন বিদ্যাসাগরের স্মৃতি রক্ষার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা হচ্ছে না। এতে কি প্রমাণ হয় যে বিদ্যাসাগরের জীবন আমাদের দেশে নিষ্ফল হয়েছে? তা মোটেই নয়। বিদ্যাসাগর আপন মহত্ত্বদ্বারা দেশে অমর স্থান অধিকার করেছেন। নিষ্ফল হয়েছে তাঁর স্মরণসভা। বিদ্যাসাগরের জীবনের যে উদ্দেশ্য তা তিনি নিজের ক্ষমতা বলেই সাধন করেছেন ; স্মরণসভার যে উদ্দেশ্য তা সাধন করার ক্ষমতা স্মরণসভার নেই, উপায়ও সে জানেনা। এই লেখাগুলি পড়তে পড়তে মনে হয় রবি ঠাকুর হয়তোবা ভবিষ্যতে তাঁকে নিয়ে যে স্মরণ সভার মাতামাতি হবে সে সম্পর্কেই যেন আক্ষেপ করে গেছেন। তাই তিনি তাঁর গানেও লিখেছেন—'তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।' আসলে আমরা শুধু আচারকে পূজ্য করে ধর্মকে খর্ব করি প্রতি নিয়ত।

