কারাগার নয় আশ্রম!
আজ স্বাধীনতা দিবস আবার এই দিনটি শ্রীঅরবিন্দের শুভ জন্মদিন। শ্রীঅরবিন্দ নিজেই নিজের উন্মোচক, প্রকাশক। নিগূঢ়িত চৈত্য-পুরুষের তিনিই চেতয়িতা। অরবিন্দ ঈশ্বরের নির্বাচিত তাই তাঁর ঈশ্বরে উত্তরণ, ঈশ্বরে অধিষ্ঠান, ঈশ্বরে বিকিরণ। কিন্তু তার উপর পড়ল ব্রিটিশ সরকারের কোপদৃষ্টি। কারণ অরবিন্দ দেশজুড়ে ক্ষাত্রতেজ জাগাতে চাইছিলেন, সশস্ত্র বিদ্রোহে দেশকে দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে। বিচ্ছিন্ন হত্যা বা সন্ত্রাস নয়, ব্যাপক বিপ্লব। সেই উদ্দেশ্যেই গ্রামে গ্রামে গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ করলেন অরবিন্দ। দেশময় প্রস্তুতির বিস্তৃতি। আর প্রকাশ্যে লিখতে লাগলেন ইংরেজি দৈনিক বন্দেমাতরম-এ। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে অরবিন্দ লিখলেন—কল্পলোকের মাধুর্য বিতরণ করে, চিন্তা রাজ্যে জাগরণ এনে দিয়ে দেশবাসীকে তাদের দেশমাতার মহিমাময়ী মূর্তি দেখিয়ে, হৃদয়ে তাদের প্রেম ও আবেগের বন্যা বইয়ে দিয়ে, জাতিকে তিনি প্রকৃত এক জাতি হিসেবে গড়ে তোলবার জন্য জীবনযাপন করেছিলেন।' দেশভক্তি বিশ্বশক্তিরই প্রকাশকলা। আর বিশ্বশক্তিই মা। জগন্মাতাই দেশমাতা। 'বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি।' অরবিন্দও চাইলেন সংঘ শক্তি, পূর্ণসিদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবার দিব্যায়ত দুর্বার দৃঢ়তা। বন্দেমাতরমেই স্বাধীনতার আদর্শ উচ্চনাদে প্রথম প্রচারিত হলো। অরবিন্দ বললেন, স্বাধীনতার কোন বিকল্প নেই। যত ভদ্র সুশাসনই হোক, স্বাধীনতা স্বাধীনতাই। আর কি মন্ত্র! বন্দেমাতরম্। মাকে বন্দনা করি। মায়ের চরণে প্রণত হই। এমন মন্ত্র না হলে বোধহয় দেশ উদ্বোধিত হয় না। শ্রদ্ধায় পরিশুদ্ধ হয় না। পবিত্রীকরণের সাবিত্রী মন্ত্রই মা। অমল মন্ত্র—অনল মন্ত্র। সেই মন্ত্রের প্রথম উদগাতা বঙ্কিমচন্দ্র আর প্রথম হোতা অরবিন্দ। কিন্তু মানুষ কই? ব্রিটিশ কারাগারে বন্দি হওয়ার পর অরবিন্দ সেই কারাগারকেই করে নিলেন নিজের যোগাশ্রম। শ্রীঅরবিন্দ লিখছেন : অনেকদিন হৃদয়স্থ নারায়ণের সাক্ষাৎ দর্শনের জন্য প্রবল চেষ্টা করেছিলাম, উৎকট আশা পোষণ করেছিলাম জগতদ্ধাতা পুরুষোত্তমকে বন্ধুভাবে, প্রভুভাবে লাভ করি। কিন্তু সহস্র সাংসারিক বাসনার টান, নানা কর্মে আসক্তি, অজ্ঞানের প্রগাঢ় অন্ধকারে তাহা পারিনি। পরমদয়ালু সর্বমঙ্গলময় শ্রীহরি সেই সকল শত্রুকে এক কোপে নিহত করে তার সুবিধা করলেন, যোগাশ্রম দেখালেন, স্বয়ং গুরুরূপে, সখারূপে সেই ক্ষুদ্র সাধন-কুটিরে অবস্থান করলেন। সেই আশ্রম ইংরেজের কারাগার। অরবিন্দ লিখছেন, 'শ্রান্ত কয়েদী নিদ্রার শরণ নিয়ে জেলের এই একমাত্র সুখ অনুভব করে। এই সময় দুর্বলচেতা নিজের দুর্ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ জেলদুঃখ ভেবে কাঁদে। ভগবদ্ভক্ত নীরব রাত্রিতে ঈশ্বরসান্নিধ্য অনুভব করে প্রার্থনায় বা ধ্যানে আনন্দ ভোগ করেন। রাত্রিতে এই দুর্ভাগ্য-পতিত সমাজ- পীড়িত তিন সহস্র ঈশ্বরসৃষ্ট প্রাণীর সেই আলিপুর জেলস্বরূপ প্রকাণ্ড যন্ত্রণাগৃহ বিশাল নীরবতায় মগ্ন হয়।' জেলের মধ্যে তাঁর মেসোমশাই সঞ্জীবনীর সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র গীতা আর উপনিষদ এই দুটি বই অরবিন্দের হাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অরবিন্দ প্রত্যক্ষ করলেন স্বয়ং ভগবান বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণই তার হাতে গীতা তুলে দিলেন আর ভগবৎ শক্তি তাঁর মধ্যে প্রবেশ করল।আমার জীবনে এক আশ্চর্য বৈপরীত্য দেখে আসছি যে, আমার হিতৈষী বন্ধুগণ আমার যতই না উপকার করুন, অনিষ্টকারীগণ—(শত্রু কাকে বলব, শত্রু আমার আর নেই)—শত্রুই অধিক উপকার করেছেন। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের কোপদৃষ্টির ফলে আমি ভগবানকে পেলাম।

