হিন্দুধর্মের সাধারণ ভিত্তি
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, আধ্যাত্মিক দিক থেকে পরব্যূহভেদ বা অপরের আগ্ৰাসন বন্ধ করা তাঁর ধর্মপ্রচারের অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি বলছেন, "অন্যান্য সমাজ ও সম্প্রদায় ভারতের সর্বত্র প্রচার করেছেন কিন্তু বুদ্ধের পর আমরাই প্রথম ভারতের সীমা লঙ্ঘন করে সমগ্ৰ পৃথিবীতে ধর্মপ্রচারের তরঙ্গ প্রবাহিত করতে চেষ্টা করছি।" হিন্দুধর্মের সাধারণ ভিত্তি আবিষ্কার করা এবং জাতীয় চেতনা জাগ্রত করে দেওয়াই যে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সেকথা তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। তিনি বললেন, বর্তমানকালে হিন্দু বলতে ভারতের তিনটি সম্প্রদায় বোঝায়—প্রথম গোঁড়া বা গতানুগতিক সম্প্রদায়, দ্বিতীয় মুসলমান আমলের সংস্কারক সম্প্রদায়সমূহ এবং তৃতীয় আধুনিক সংস্কার সম্প্রদায়সমূহ। আজকাল উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত সকল হিন্দু কেবল একটি বিষয়ে একমত তা হলো গো- মাংস ভোজনে সকল হিন্দুরই আপত্তি। অথচ বেদ- বিশ্বাসে সকলে একমত নয়। স্বামীজী এই বিষয়ে সকলকে সচেতন ও জাগাতে চেয়েছেন। কারণ বুদ্ধের ভাব ভারত এখনও আত্মস্থ করতে পারেনি। বুদ্ধের বাণী শুনে প্রাচীন ভারত মুগ্ধই হয়েছিল, নব বলে সঞ্জীবিত হয়নি। যদিও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব সর্বত্রই জাজ্বল্যমান। ভারত কখনো কোন কিছু পেয়ে হারায় না, কেবল সেটি আয়ত্ত করতে বা নিজের অঙ্গীভূত করে নিতে সময়ের প্রয়োজন হয়। বুদ্ধ যজ্ঞে প্রাণিবধের মূলে কুঠারাঘাত করলেন, ভারত সেইভাব আর ফেলে দিতে পারেনি। এখন আমাদের পক্ষে গো-বধ অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বামীজী বললেন, আমি সকল সম্প্রদায়ের। আমরাই সনাতন হিন্দু। কিন্তু ছুঁৎমার্গের সঙ্গে আমাদের কিছু মাত্র সংস্রব নেই। এগুলি হিন্দু ধর্ম নয়, এই ছুঁৎমার্গ আমাদের কোন শাস্ত্রে নেই। ভারত বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে, কলা কুশলের দিক থেকে, শিল্প, গনিত, দর্শনের দিক থেকে কোন অংশে হীন নয়। ছুঁৎমার্গগুলি প্রাচীন আচারের অননুমোদিত একটি কুসংস্কার, আর চিরদিনই এগুলি জাতীয় অভ্যুদয়ে বাধা সৃষ্টি করেছে। তাই ভারতকে মোহনিদ্রা থেকে, শত শত শতাব্দীব্যাপী দীর্ঘ নিদ্রা থেকে জাগাতে হবে এবং পৃথিবীর সমগ্র জাতির মধ্যে তাকে তার প্রকৃত স্থান গ্রহণ করতে হবে।

