ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত বীর বটুকেশ্বর দত্ত
বিশেষ প্রতিবেদন: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বহু বীরের রক্ত ও আত্মত্যাগের কাহিনি লুকিয়ে রয়েছে। তাঁদেরই অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত। যিনি ফাঁসির মঞ্চে অমর হওয়া শহীদ ভগৎ সিংয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ, স্বাধীন ভারতের ইতিহাস তাঁকে যেন অনেকটাই আড়ালে রেখে দিয়েছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে চরম আর্থিক অনটন আর অবহেলার মধ্যে কেটেছে এই মহান বিপ্লবীর শেষ জীবন।
১৯১০ সালের ১৮ নভেম্বর তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ থানার ওয়াড়ি গ্রামে জন্ম হয় বটুকেশ্বর দত্তের। তাঁর পিতার নাম ছিল গোষ্ঠবিহারী দত্ত। তবে পিতার কর্মসূত্রে তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের একটা বড় অংশ কাটে উত্তরপ্রদেশের কানপুরে। কানপুরের পণ্ডিত পৃথ্বীনাথ হাইস্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কানপুরে থাকাকালীনই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ১৯২৪ সালে সেখানে তাঁর আলাপ হয় তরুণ বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে। ভগৎ সিংয়ের ব্যক্তিত্ব এবং দেশপ্রেমের আদর্শ গভীরভাবে প্রভাবিত করে বটুকেশ্বরকে। তিনি হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনে (এইচএসআরএ) যোগ দেন এবং চন্দ্রশেখর আজাদের মতো প্রবাদপ্রতিম বিপ্লবীর সান্নিধ্যে এসে বোমা তৈরির কৌশল রপ্ত করেন।
১৯২৯ সাল। ব্রিটিশ সরকার দেশজুড়ে বিপ্লবী আন্দোলন দমন করতে দুটি অত্যন্ত দমনমূলক আইন— 'পাবলিক সেফটি বিল' এবং 'ট্রেড ডিসপিউটস বিল' পাস করানোর চেষ্টা করছিল। পাশাপাশি, জাতীয়তাবাদী নেতা লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে উত্তাল ছিল গোটা দেশ। এই পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের ঘুম ভাঙাতে এবং ব্রিটিশদের যোগ্য জবাব দিতে এক ঐতিহাসিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে এইচএসআরএ। ঠিক হয়, দিল্লির সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে (বর্তমান ভারতের সংসদ ভবন) বোমা নিক্ষেপ করা হবে। তবে এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা ছিল না, বরং নিজেদের দাবি ও প্রতিবাদ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল দর্শকদের গ্যালারি থেকে অ্যাসেম্বলির শূন্য স্থানে দুটি কম ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ছুড়ে মারেন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো সভাগৃহ, চারদিক ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। লাল রঙের লিফলেট বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে তাঁরা গর্জে ওঠেন— ‘ইঙ্কলাব জিন্দাবাদ’ (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক) এবং ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’ স্লোগানে। লিফলেটে লেখা ছিল, "বধিরকে শোনাতে হলে আওয়াজ জোরালো হওয়া প্রয়োজন।" বিস্ফোরণের পর তাঁরা অনায়াসেই পালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা ধরা দেন। উদ্দেশ্য ছিল, আদালতের কাঠগড়াকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা।
বিচারের পর ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে আন্দামানের সেলুলার জেলে (কালাপানি) পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জন স্যান্ডার্স হত্যার মামলায় ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেবের ফাঁসির সাজা হলেও, বটুকেশ্বর দত্ত আন্দামানের অন্ধ কুঠুরিতেই বন্দি থাকেন। সেলুলার জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর চলত অমানুষিক অত্যাচার। নিম্নমানের খাবার এবং পশুর মতো আচরণের বিরুদ্ধে জেলের ভেতরেই তীব্র আন্দোলন শুরু করেন বটুকেশ্বর।
তিনি ও ভগৎ সিং জেলে বন্দিদের অধিকার আদায়ে ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। একনাগাড়ে ১১৪ দিন চলেছিল সেই অনশন। তাঁদের এই জেদ ও আত্মত্যাগের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ প্রশাসন। বন্দিদের অধিকার আংশিকভাবে স্বীকৃত হয়। দীর্ঘ বন্দিজীবনের জেরে বটুকেশ্বর দত্তের শরীরে বাসা বাঁধে মারণ রোগ যক্ষ্মা (টিবি)। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হওয়ায় ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসা যাঁর রক্তে, তিনি ঘরে বসে থাকার পাত্র ছিলেন না। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন শুরু হলে, অসুস্থ শরীর নিয়েই তিনি তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলস্বরূপ, ফের তাঁকে চার বছরের জন্য মোতিহারি জেলে বন্দি করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি চিরতরে কারাগার থেকে মুক্তি পান।
দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু স্বাধীন ভারতের ভাগ্যবিধাতারা এই মহান বিপ্লবীর খোঁজ রাখলেন না। দেশভাগের পর তিনি বিহারের পটনায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে অঞ্জলি দেবীকে বিয়ে করেন তিনি। কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বা সরকারি পদের লোভ তাঁর ছিল না। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম যে সম্মান ও সুযোগের প্রয়োজন, তাও জোটেনি তাঁর কপালে।
সংসার চালাতে এই প্রবীণ বিপ্লবীকে একসময় বাস পরিবহনের ব্যবসা করতে হয়েছিল। এমনকি একটি সিগারেট কারখানায় এজেন্টের কাজও করতে হয়েছে তাঁকে। যে মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের যৌবনের সোনালী দিনগুলো জেলের অন্ধকারে কাটিয়ে দিলেন, স্বাধীন দেশে তাঁকে দু’বেলা অন্নের সংস্থানের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পেনশন বা আর্থিক সাহায্য সময়মতো মেলেনি। এই চরম অবহেলা ও দারিদ্র্যের মাঝেই ১৯৬০-এর দশকে তাঁর শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে।
অসুস্থতা যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন বিহার সরকারের টনক নড়ে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাঁকে পটনা এবং পরে দিল্লির এইমস (AIIMS)-এ ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর মুখে ছিল সেই চেনা চওড়া হাসি। ১৯৬৫ সালের ২০ জুলাই মাত্র ৫৪ বছর বয়সে দিল্লির হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বীর বাঙালি বিপ্লবী।
মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্য যেন তাঁর প্রিয় কমরেড ও বন্ধু ভগৎ সিংয়ের পাশেই করা হয়। তাঁর সেই শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে পঞ্জাবের ফিরোজপুরের কাছে হোসেনিওয়ালা জাতীয় শহীদ স্মারকে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে বহু বছর আগে ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে দাহ করা হয়েছিল, ঠিক সেই জায়গাতেই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সৎকার করা হয় বটুকেশ্বর দত্তকে। আজ হয়তো ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে তাঁর নাম খুব সংক্ষেপে লেখা থাকে, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে বটুকেশ্বর দত্তের অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সহজ-সরল দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীক হয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদয়ে।

