অবকাশ
ব্রিটিশ বধের ব্লু প্রিন্ট হত গলসিতে
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: চারিদিকে গাছে ঘেরা, গলসীর চান্নাগ্রামে খড়ি নদীর ধারে একটি আশ্রম। আপাতদৃষ্টিতে পরিবেশ শান্ত। কিন্তু এখানেই তৈরি হত ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের ব্লুপ্রিন্ট। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত, ভগৎ সিংহের ঘনিষ্ঠ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৭ সাল নাগাদ আশ্রমটি তৈরি করেন।
জানা যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ থেকে উজ্জীবিত হয়ে দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ ঘটানোর বাসনা নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘যতীন্দর উপাধ্যায়’ নামে গায়কোয়াড় রাজার এক সৈনিকের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে যোগ দিয়েছিলেন সেনায়। উত্তর পশ্চিম ভারতে বিভিন্ন উপজাতিদের ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন। কলকাতার মুরারিপুকুরে ব্রিটিশের উপর বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন যুবক যতীন্দ্রনাথ। পরে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র স্থাপিত হয় গদর পার্টির সঙ্গে। কিন্তু সেখানে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। মুক্তিলাভের পরে ১৯০৭ সালে চান্নায় আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সন্ন্যাস গ্রহণ করে নতুন নাম হয় নিরালম্ব স্বামী। বিপ্লবীদের আখড়া হয়ে উঠেছিল আশ্রম। এখানে এক সময় এসেছিলেন ভগত সিং, ভগত সিংয়ের বাবা কিষেণ সিং, বটুকেশ্বর দত্ত, লালা লাজপত রায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। এখানে থেকে তাঁরা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করতেন। গলসির বাসিন্দা নিরুপম দাস বলেন, বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথের একাধিক দুরন্তপনার নানা ঘটনা এখনও জনশ্রুতির মতো রয়ে গিয়েছে। আমরা শুনেছি তাঁর বাবা কালিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি তাঁকে শান্ত করতে মহীনগর শ্মশানে আসা এক কালী সাধকের কাছে তাঁকে নিয়ে যান। সাধুবাবা একটি রক্ষাকবচও দিয়েছিলেন। যতীন্দ্রনাথ নাকি সাধুকে বলছিলেন, শুনেছি বুলেট আপনাকে স্পর্শ করে না? সাধুর জবাব, ছিল হ্যাঁ। তখন যতীন্দ্রনাথ লুকনো একটি পিস্তল বের করে সাধুর উপর চালাতে উদ্যত হন। প্রাণের ভয়ে সাধু দৌড়ে পালিয়ে যান।
কিন্তু এই পরিবেশ আশ্রম করার জন্য বেছে নেওয়া হল কেন? চারদিকে গাছের আড়াল। ফলে পুলিসের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য আশ্রমের মধ্যে একটি বট গাছের তলা বেছে নেওয়া হয়। সেটিই ছিল বিপ্লবীদের আস্তানা। গলসির বাসিন্দা, স্বাধীনতা সংগ্রামী ফকিরচন্দ্র রায় তখন নিয়মিত আসতেন আশ্রমে। তাঁর কাজ ছিল, গোপনে চিঠি আদান প্রদান করা। একই সাথে পুলিসের গতিবিধির উপরে নজর রাখা।
স্থানীয়রা বলেন, বহু বিপ্লবীর স্মৃতিধন্য এই আশ্রম। আশ্রম কর্তৃপক্ষ সীমিত ক্ষমতায় আশ্রম রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করছেন। তবে বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কার্যত ভুলতে বসেছে নতুন প্রজন্ম। শিক্ষক ফিরোজ আলি কাঞ্চন বলেন, অগ্নিযুগের আশ্রম প্রচারের অন্তরালে। আশ্রমের খড়ের চাল নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়ছে। আশ্রমকে রক্ষা করা করতে প্রশাসন এগিয়ে আসুক। তাঁর দাবি, কুলগড়িয়া মোড়ে বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হোক। পাশাপাশি ওখানে আশ্রমে যাওয়ার পথ নির্দেশিকা বোর্ড লাগানো হোক।

