বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

স্বাধীনতা দিবসে একটা প্রশ্ন: আমরা কি নিজেদের চিন্তা নিজেরাই করি? 

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬
স্বাধীনতা দিবসে একটা প্রশ্ন: আমরা কি নিজেদের চিন্তা নিজেরাই করি? 
দীপ্র ভট্টাচার্য (পেশায় ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্ট্যান্ট ও এআই স্ট্র্যাটেজিস্ট)দীপ্র ভট্টাচার্য (পেশায় ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্ট্যান্ট ও এআই স্ট্র্যাটেজিস্ট)
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

স্বাধীনতা দিবস এলেই আমরা স্বাধীনতার কথা বলি। কিন্তু একটু অন্য দিক থেকে ভাবা যাক। ধরা যাক, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি ঠিক করলেন—আজ থেকে আমি স্বাধীনভাবে ভাবব। তারপর চা খেলেন সেই ব্র্যান্ডের, যেটা বিজ্ঞাপন বলেছে ‘স্মার্ট মানুষের পছন্দ’। ফোন খুলে সেই খবরগুলোই দেখলেন, যেগুলো আপনার আগের পছন্দের সঙ্গে মেলে। দুপুরে যে মতামতটি দিলেন, সেটি আসলে গত তিন দিনে আপনার স্ক্রিনে বারবার দেখা দশটি মতামতের গড়। সন্ধ্যায় বন্ধুর সঙ্গে তর্ক করলেন, আর শেষে বুঝলেন—আপনি আসলে কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। সিদ্ধান্তটি আপনার হয়ে অনেক আগেই নেওয়া হয়ে গেছে। স্বাধীনতার সবচেয়ে আধুনিক সংজ্ঞাটি বোধহয় তাই—আপনি নিজের হাতে রিমোট ধরে আছেন, কিন্তু চ্যানেল বদলানোর পরামর্শটা অন্য কেউ দিচ্ছে।

আমরা ভাবি, মতামত মানে নিজের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনও পবিত্র বস্তু। যেন মাথার মধ্যে একটা ছোট্ট সংসদ বসে আছে, সেখানে যুক্তি, অভিজ্ঞতা, বিবেক—সবাই বসে আলোচনা করে, তারপর ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত হয়। বাস্তবে ব্যাপারটা অনেক কম গণতান্ত্রিক। ছোটবেলায় পরিবার আমাদের শেখায় কী পছন্দ করতে হবে, কাকে সম্মান করতে হবে, কোন কথায় রাগ করতে হবে, কোন বিষয়ে চুপ থাকতে হবে। বড় হয়ে সমাজ সেই শিক্ষার ওপর নতুন রং লাগায়। তারপর আসে বন্ধু, কর্মক্ষেত্র, সংবাদমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া। শেষ পর্যন্ত আমাদের ‘নিজস্ব মতামত’ অনেক সময় এমন এক বাড়ি, যার ইট অন্যরা দিয়েছে, শুধু নামফলকটি আমাদের।

এখানেই মনস্তত্ত্বের একটি মজার খেলা আছে। মানুষ নিজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য পছন্দ করে। কারণ নতুন কোনও তথ্য যদি আমাদের বিশ্বাসকে ধাক্কা দেয়, মস্তিষ্ক সেটিকে শুধু ‘তথ্য’ হিসেবে নেয় না—অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবেও নেয়। ফলে আমরা সত্য খুঁজি না, নিজের সত্যকে সমর্থন করে এমন প্রমাণ খুঁজি। এই প্রবণতার একটা সুন্দর নাম আছে— “কনফারমেশান বায়াস”। নামটা ইংরেজি, অসুখটা কিন্তু একেবারে দেশি। আমরা আগে ঠিক করি কী বিশ্বাস করব, তারপর যুক্তি খুঁজি কেন বিশ্বাসটা ঠিক।

সোশ্যাল মিডিয়া এই দুর্বলতাটিকে শুধু চেনে না, আদর করে। আপনি যে পোস্টে থামলেন, যে ভিডিওটা দু’বার দেখলেন, যে ছবিতে একটু বেশি সময় চোখ রাখলেন—সবই আপনার পছন্দের মানচিত্রে ছোট ছোট দাগ। এ-আই অ্যালগরিদম সেই দাগ জুড়ে একটা রাস্তা বানায়। তারপর আপনাকে সেই রাস্তা দিয়েই হাঁটায়। ফলে একদিন হঠাৎ মনে হয়, ‘সবাই তো আমার মতোই ভাবছে!’ আসলে সবাই আপনার মতো ভাবছে না। আপনি শুধু এমন একটা অডিটোরিয়ামে ঢুকে পড়েছেন, যেখানে আপনার মতো ভাবা লোকজনেরই মাইক চালু আছে। পৃথিবী বদলায়নি, আপনার জানলাটা বদলে গেছে।

অ্যালগরিদমের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, সে আমাদের সঙ্গে তর্ক করে না। সে আমাদের পছন্দকে সম্মান করে—অতিরিক্ত সম্মান। আপনি যদি পাঁচটি ভিডিওতে রেগে যান, সে ষষ্ঠটি এনে বলে, ‘আরও রাগবেন?’ আপনি যদি ষড়যন্ত্রের গল্প পছন্দ করেন, সে আরও রহস্য এনে দেয়। আপনি যদি কোনও রাজনৈতিক মতের প্রতি অনুরাগী হন, সে সেই মতের আরও তীব্র সংস্করণ দেখাতে থাকে। কারণ এ-আই অ্যালগরিদমের কাছে আপনার মানসিক শান্তির মূল্য যতটা নয়, আপনার মনোযোগের মূল্য অনেক বেশি। আপনার মনোযোগ তার কাছে আধুনিক যুগের মুদ্রা।

অদ্ভুত ব্যাপার হল, পরিবারও একসময় এমনই একটি অ্যালগরিদম ছিল। বাবা-মা বলতেন, ‘এই ছেলেটার সঙ্গে মিশবে না।’ আমরা কারণ জানতাম না, কিন্তু নির্দেশটি মনে রাখতাম। বলা হত, ‘এই বিষয়টা পড়লে চাকরি আছে’, ‘ওই পেশায় ভবিষ্যৎ নেই’, ‘ভদ্রলোকেরা এভাবে কথা বলে না।’ তখন আমাদের পৃথিবী ছিল ছোট। ফলে পরিবারের মতামতই ছিল পৃথিবীর আবহাওয়া। বড় হয়ে আমরা সেই আবহাওয়া সঙ্গে করে নিয়ে বেরিয়েছি। এখন বাবা-মায়ের বদলে কখনও ইনফ্লুয়েন্সার, কখনও ইউটিউবার, কখনও অচেনা হাজার মানুষের কমেন্ট আমাদের বলে দেয়—কী ভাবা উচিত, কী নিয়ে হাসা উচিত, কী নিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত। 

আর ট্রেন্ড? ট্রেন্ড আসলে আধুনিক কালের সবচেয়ে ভদ্র স্বৈরশাসক। সে কাউকে জোর করে না। শুধু বলে, ‘সবাই করছে।’ এই তিনটি শব্দের মধ্যে মানুষের সামাজিক ভয় লুকিয়ে আছে। মানুষ একা হতে ভয় পায়। তাই নিজের পছন্দের চেয়ে অনেক সময় নিজের দলটির পছন্দকে নিরাপদ মনে করে। আপনি হয়তো একটা সিনেমা পছন্দ করেননি, কিন্তু সবাই প্রশংসা করছে। দুদিন পর আপনি বলবেন, ‘আসলে সিনেমাটা খারাপ না।’ কেন? সিনেমা বদলায়নি। বদলেছে আপনার সামাজিক অবস্থান। মানুষের মস্তিষ্ক মাঝে মাঝে সত্যের চেয়ে দলবদ্ধ থাকার নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

এই জায়গায় স্বাধীনতার প্রশ্নটি আরও কঠিন। স্বাধীনতা মানে কি আমি যা খুশি তাই বলব? নাকি স্বাধীনতা মানে আমি কেন এটা বলছি, সেটাও একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারব? দ্বিতীয়টি অনেক কঠিন। কারণ নিজের চিন্তাকে প্রশ্ন করা মানে নিজের অহংকে একটু অপমান করা। আমরা অন্যের ভুল ধরতে আনন্দ পাই; নিজের চিন্তার ভেতরে ফাটল খুঁজতে চাই না। নিজের মতামতকে ‘আমি’ বলে ভাবতে শুরু করলে মত বদলানোও তখন পরাজয় বলে মনে হয়। অথচ চিন্তা বদলানো অনেক সময় পরাজয় নয়—এটাই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার প্রমাণ।

একজন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে সহজ উপায় তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং তার মাথার ভেতর এমন কিছু কণ্ঠস্বর বসিয়ে দেওয়া, যাদের সে নিজের কণ্ঠ বলে ভুল করবে। এই কণ্ঠস্বর কখনও পরিবারের, কখনও সমাজের, কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠের, কখনও অ্যালগরিদমের। ভয়ংকর ব্যাপার হল, বাইরের কারও তখন আর তাকে আটকানোর দরকার হয় না। সে নিজেই নিজের পাহারাদার হয়ে যায়।

তাই স্বাধীনতা দিবসে হয়তো পতাকার দিকে তাকিয়ে শুধু একটা প্রশ্ন করা যায়—‘আমি যা ভাবছি, সেটা কি সত্যিই আমার?’ আমার পছন্দটা কোথা থেকে এল? আমার রাগটা কার কাছ থেকে শেখা? যে মানুষটিকে আমি অপছন্দ করি, তাকে অপছন্দ করার কারণটা কি আমার নিজের অভিজ্ঞতা, নাকি বহুবার দেখা কোনও পোস্ট? যে মতামতটিকে আমি ‘কমন সেন্স’ বলছি, সেটি কি সত্যিই কমন সেন্স, নাকি আমার চারপাশের লোকেদের একমত হওয়ার ফল?

হয়তো স্বাধীনতার সবচেয়ে কঠিন কাজ কোনও শাসকের হাত থেকে মুক্ত হওয়া নয়। নিজের মাথার ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য শাসকদের চিনে ফেলা। একদিন ফোনটা সরিয়ে রেখে, পরিবারের শেখানো কথাগুলোকে একবার সন্দেহ করে, ট্রেন্ডের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, নিজের প্রিয় মতামতটিরও জেরা করে যদি আমরা বলতে পারি—‘আমি জানি না, আমাকে ভাবতে হবে’—তাহলে সেই অস্বস্তিকর বাক্যটির মধ্যেই স্বাধীনতার একটা গভীর রূপ লুকিয়ে আছে।

কারণ স্বাধীন মানুষ সে নয়, যে সবসময় নিজের মতামত জানে। স্বাধীন মানুষ সে, যে প্রয়োজন হলে নিজের মতামতের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে। আর হয়তো সেই কারণেই স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু সেন্সরশিপ নয়—অচিন্তিত নিশ্চয়তা। যে মুহূর্তে আমরা মনে করি, ‘আমি ঠিক, কারণ সবাই আমার সঙ্গে একমত’, সেই মুহূর্তেই আমাদের স্বাধীন চিন্তার দরজায় তালা পড়ে। তালাটা বাইরে থেকে কেউ লাগায় না। চাবিটাও আমাদের হাতেই থাকে। শুধু আমরা ভুলে যাই, কোন পকেটে রেখেছি।

হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা দিবসের প্রশ্ন হবে, এ-আই আমাদের হয়ে কতটা ভাববে, আর আমরা নিজেদের হয়ে কতটা ভাবব? যন্ত্র আমাদের দ্রুত উত্তর দিতে পারে, আমাদের পছন্দ বুঝতে পারে, এমনকি আমাদের চেয়ে ভালো করে যুক্তি সাজিয়েও দিতে পারে; কিন্তু নিজের সন্দেহ, নিজের দ্বিধা, নিজের ভুল থেকে যে চিন্তার জন্ম—তার কোনও শর্টকাট নেই। বিপদ এ-আই নয়, বিপদ সেই দিন, যেদিন আমরা প্রশ্ন করাটাও তাকে দিয়ে দেব। তখন উত্তর থাকবে প্রচুর, কিন্তু চিন্তা থাকবে না। তাই ভবিষ্যতের স্বাধীনতা হয়তো এটাই হবে, যে এ-আইকে ব্যবহার করব, কিন্তু নিজের বিবেককে আউটসোর্স  করব না; যন্ত্রকে প্রশ্ন করব, কিন্তু নিজের প্রশ্ন করার অধিকারটা যন্ত্রের হাতে তুলে দেব না। কারণ মানুষকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তার হাত বেঁধে নয়, বরং তার হয়ে চিন্তা করে দিয়ে।

আরও অবকাশ খবর