অবকাশ
লালমাটির বাঁকে বাঁকে ফিসফিসানি ইতিহাসের: এক টুকরো মল্লভূম ভ্রমণ
প্রকাশিত: ৪ জুলাই, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন: ইট-পাথরের চেনা জাঁতাকল আর রোজকার ব্যস্ততার ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে বাঙালি বরাবরই পায়ে সর্ষে দিয়ে ঘোরে। তবে হিমালয়ের বরফ আর দীঘার সমুদ্রের ভিড় এড়িয়ে যদি ইতিহাসের গন্ধ মাখতে চান, তবে গন্তব্য হোক বাঁকুড়ার প্রাচীন জংশন বিষ্ণুপুর। একদা মল্লভূম রাজ্যের রাজধানী এই শহরটির আনাচে-কানাচে আজও লুকিয়ে রয়েছে পোড়ামাটির আশ্চর্য জাদুগরি। কলকাতা থেকে মাত্র ১৩৮ কিলোমিটার দূরের এই ঐতিহাসিক জনপদ পর্যটকদের দিচ্ছে এক অনন্য মানসিক তৃপ্তি।
টেরাকোটার আঙিনায় ইতিহাসের হাতছানি
বিষ্ণুপুর স্টেশনে নেমে টোটো বা রিকশায় চড়লেই চোখে পড়বে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা সাবেক এক শহর। তবে পিচ রাস্তার দু’পাশে আজও উঁকি দেয় সেই চেনা লালমাটি।
• রাসমঞ্চ: শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে গেলেই প্রথমে স্বাগত জানাবে সবুজ কেয়ারি করা বাগান ঘেরা বিশাল পিরামিড আকৃতির পোড়া ইটের ইমারত। ১৬০৭ সালে মল্লরাজ বীর হাম্বিরের তৈরি এই রাসমঞ্চের খিলানগুলিতে কান পাতলে আজও যেন সেকালের রাস উৎসবের জৌলুস আর ইতিহাস ফিসফিস করে কথা বলে।
• জোড়বাংলা ও শ্যামরাই: বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এখানকার জোড়বাংলা মন্দির এবং পাঁচ-চূড়াবিশিষ্ট শ্যামরাই মন্দির। দেওয়ালে দেওয়ালে খোদাই করা রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনি এবং পোড়ামাটির অলঙ্করণ চোখ জুড়িয়ে দেয়।
• মদনমোহন ও মৃন্ময়ী দেবী: মল্লরাজাদের আরাধ্য দেবতা মদনমোহন মন্দির ছাড়াও পর্যটকেরা ভিড় করেন বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপুজোর কেন্দ্র মৃন্ময়ী মন্দিরে।
• দলমাদল কামান: খোলা আকাশের নীচে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার লোহার দলমাদল কামান মনে করিয়ে দেয় বর্গি আক্রমণ প্রতিহত করার বীরগাথা।
সুর, সুতো আর পোড়ামাটির সওদা
বিষ্ণুপুর শুধু দেখার নয়, ছোঁয়ার এবং সংগ্রহ করারও বটে। শহরের ইতিহাস যেমন যদুভট্ট বা গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বিষ্ণুপুর ঘরানা'র ধ্রুপদী সুরে সমৃদ্ধ, তেমনই সমৃদ্ধ এখানকার কুটির শিল্প। কেনাকাটার জন্য চকবাজার বা স্থানীয় দোকানগুলিতে মিলবে:
• বালুচরী শাড়ি: রেশমী জমিতে নিখুঁত জরির সুতোয় বোনা পৌরাণিক আখ্যানের আঁচল। তাঁতিদের বাড়ি গিয়ে সরাসরি এই শাড়ি বোনার কাজ চোখের সামনে দেখার অভিজ্ঞতা এক আলাদা পাওনা।
• টেরাকোটার হস্তশিল্প: বিষ্ণুপুর থেকে সামান্য দূরে পাঁচমুড়া গ্রাম টেরাকোটার জন্য বিশ্ববিখ্যাত হলেও, বিষ্ণুপুর শহরের বুকেই পেয়ে যাবেন পোড়ামাটির বিখ্যাত মল্লভূম ঘোড়া, লণ্ঠন এবং সুদৃশ্য শোপিস।
মহকুমা প্রশাসন ও রাজ্য পর্যটন দফতর ঐতিহ্যবাহী এই শহরকে সাজাতে নতুন উদ্যোগ শুরু করেছে। শহরের প্রবেশপথগুলিতে সুদৃশ্য ঐতিহাসিক ফলক বসানো এবং পরিবেশবান্ধব যানের মাধ্যমে মন্দিরগুলিকে 'ক্লাস্টার' বা গুচ্ছে বেঁধে ঘোরানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন
• যাতায়াত: কলকাতা থেকে সড়কপথে প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লাগে। রেলপথে খড়্গপুর-আদ্রা-বাঁকুড়া লাইনের ট্রেনে সরাসরি পৌঁছে যাওয়া যায় বিষ্ণুপুর স্টেশনে।
• থাকা-খাওয়া: রাত্রিবাসের জন্য শহরে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের (WBTDCL) ট্যুরিস্ট লজ ছাড়াও বহু ভালো মানের বেসরকারি হোটেল ও লজ রয়েছে। উৎসবের মরসুমে বা অন্য সময় আসতে হলে অবশ্য আগেভাগে বুকিং করা জরুরি।

