ইতিহাসের এক আশ্চর্য সংযোগ: একই দিনে স্মরণে ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’ দাদাভাই নওরোজি ও বিপ্লবী অনুজাচরণ সেন
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৩০ জুন দিনটি এক অনন্য এবং গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় বহন করে। আজ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই ভিন্ন ধারার, অথচ সমভাবাপন্ন দুই মহান সেনানীর স্মৃতিবিজড়িত দিন। একজন পরাধীন ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ দাদাভাই নওরোজি, যাঁর আজ প্রয়াণ দিবস। অন্যদিকে, ব্রিটিশ শক্তির বুকে কাঁপন ধরানো অগ্নিযুগের বীর হুতাত্মা অনুজাচরণ সেন, যাঁর আজ জন্ম দিবস। ভারতের মুক্তিসংগ্রামের এই দুই ভিন্ন ঘরানার যোদ্ধাকে শ্রদ্ধা ও প্রণামে স্মরণ করছে দেশবাসী।
দাদাভাই নওরোজি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি ১৮৮৬, ১৮৯৩ এবং ১৯০৬ সালে—তিনবার কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্রিটিশ পার্লামেন্টের (হাউস অফ কমন্স) সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তাঁর লেখা 'Poverty and Un-British Rule in India' গ্রন্থে ব্রিটিশদের ‘ড্রেন থিওরি’ বা সম্পদ লুণ্ঠনের তত্ত্ব ফাঁস করে তিনি ভারতীয় অর্থনীতির আসল রূপটি তুলে ধরেছিলেন। তিনিই প্রথম কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে 'স্বরাজ' শব্দটির দাবি তোলেন। ১৯১৭ সালের ৩০ জুন এই মহান মণীষীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। ভারতের ডাকবিভাগ ১৯৬৩, ১৯৯৭ এবং ২০১৭ সালে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানকে সম্মানিত করেছে।
অগ্নিযুগের বীর শহীদ অনুজাচরণ সেনের জন্মজয়ন্তীনওরোজি যখন নিয়মতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের লড়াই চালাচ্ছিলেন, তার কয়েক দশক পরেই বাংলার বুকে তৈরি হয়েছিল সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন। সেই অগ্নিযুগেরই এক অন্যতম নক্ষত্র ছিলেন অনুজাচরণ সেন। ১৯০৫ সালের ৩০ জুন (মতান্তরে ৩ আগস্ট) খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৯২০-এর দশকে অতুল সেন, রসিকলাল দাস, কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো বিপ্লবীদের সংস্পর্শে এসে যুগান্তর দলে যোগ দেন তিনি। শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনই নয়, এলাকায় কলেরা ও বসন্ত মহামারীর সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর্তের সেবা করে মানুষের মন জয় করেছিলেন তিনি।
১৯৩০ সালের ২৫ আগস্ট কলকাতার কুখ্যাত অত্যাচারী পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যার দায়িত্ব পড়ে দীনেশ মজুমদার, অতুল সেন, শৈলেন নিয়োগী এবং অনুজাচরণের ওপর। ডালহৌসি স্কোয়ারে টেগার্টের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছুড়তে গিয়ে একটি বোমা অনুজাচরণের নিজের হাতেই ফেটে যায়। ঘটনাস্থলেই বীরের মতো প্রাণত্যাগ করেন এই হুতাত্মা বিপ্লবী। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে মৃত্যুর আগে তিনি নিজের মুখ অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, যাতে পুলিশ তাঁর সূত্র ধরে দলের অন্য বিপ্লবীদের গ্রেফতার করতে না পারে।
এই দুই মহান দেশপ্রেমিকের প্রতি দেশবাসীর পক্ষ থেকে রইল বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি ও প্রণাম।

