বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

কলকাতা থেকে ভারতের ব্যাংক- স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ২২০ বছরের উত্তরাধিকার

প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২৬
কলকাতা থেকে ভারতের ব্যাংক- স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ২২০ বছরের উত্তরাধিকার
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

কলকাতার ইতিহাসের একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য আছে। এই শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ গল্পের কোনও স্মৃতিফলক নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বি.বি.ডি. বাগের পাশ দিয়ে হেঁটে যান, অফিসে ঢোকেন, বাস ধরেন, কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন—এই অঞ্চলেই একদিন জন্ম নিয়েছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার উত্তরাধিকার আজ দুই শতাব্দী পেরিয়ে ভারতের বৃহত্তম ব্যাংকের পরিচয় বহন করছে।

১৮০৬ সালের ২ জুন। কলকাতা তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতার কেন্দ্র  । গঙ্গার ঘাটে নোঙর ফেলছে পালতোলা জাহাজ, লালদিঘির চারপাশে গড়ে উঠছে প্রশাসনিক ভবন, আর বাণিজ্যের বিস্তার নতুন এক আর্থিক ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটেই প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যাঙ্ক অব ক্যালকাটা। তিন বছর পরে, ১৮০৯ সালে, রাজকীয় সনদ পাওয়ার পর তার নতুন নাম হয় ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গল। আজকের স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া এই প্রতিষ্ঠানকেই নিজের আদি উত্তরসূরি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই ইতিহাসের একটি সূক্ষ্ম দিক মনে রাখা জরুরি। স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ১৮০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে। কিন্তু তার প্রাতিষ্ঠানিক শিকড় পৌঁছে যায় ১৮০৬ সালের ব্যাঙ্ক অব ক্যালকাটায়। সেই উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতাকেই আজ ২২০ বছরের ইতিহাস হিসেবে স্মরণ করা হয়। 

আঠারো শতকের শেষভাগের কলকাতা ছিল পরিবর্তনের শহর। ইউরোপীয় বণিক, দেশীয় ব্যবসায়ী, জাহাজ, গুদাম, নিলামঘর, বিমা, রপ্তানি—সব মিলিয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এই দ্রুত প্রসারমান বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি নির্ভরযোগ্য ব্যাংক। সেই সময়ে অর্থ লেনদেনের বড় অংশই চলত মহাজন, শরাফ বা ব্যক্তিগত ঋণদাতাদের মাধ্যমে। বৃহৎ বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য আধুনিক ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল। ব্যাঙ্ক অব ক্যালকাটা সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয়। তার প্রথম কাজ ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে আর্থিক ভিত্তি দেওয়া। তাই এই ইতিহাস কেবল একটি ব্যাংকের নয়; এটি কলকাতার বাণিজ্যিক উত্থানেরও ইতিহাস।

১৮০৯ সালে ব্যাঙ্ক অব ক্যালকাটার নাম বদলে ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গল হয়। পরে বোম্বাই ও মাদ্রাজেও প্রতিষ্ঠিত হয় আরও দুটি প্রেসিডেন্সি ব্যাংক—ব্যাঙ্ক অব বোম্বে (১৮৪০) এবং ব্যাঙ্ক অব মাদ্রাজ (১৮৪৩)। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই ঔপনিবেশিক ভারতের আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণ করে। আজকের চোখে বিষয়টি বোঝা কঠিন। তখন রিজার্ভ ব্যাংক ছিল না। ফলে প্রেসিডেন্সি ব্যাংকগুলিকে শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাজই নয়, সরকারি অর্থের রক্ষণাবেক্ষণ এবং অনেক ক্ষেত্রে আধা-কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকাও পালন করতে হতো। এই কারণেই ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গল কেবল একটি ব্যাংক ছিল না; ছিল ঔপনিবেশিক অর্থব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ। 

স্টেট ব্যাংকের ইতিহাসে কলকাতার ভূমিকা শুধু জন্মস্থানের নয়। ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গলের পুরনো ভবন ছিল তৎকালীন ডালহৌসি স্কোয়ারের আশপাশে। আজকের বি.বি.ডি. বাগে দাঁড়ালে কল্পনা করা কঠিন—একসময় এখানেই বসে নির্ধারিত হতো বৃহৎ বাণিজ্যের আর্থিক হিসাব, সরকারি অর্থপ্রবাহ, এমনকি সুদূর লন্ডনের সঙ্গে লেনদেনের প্রস্তুতি। কলকাতার ইতিহাসবিদেরা বলেন, এই শহরের অর্থনৈতিক ইতিহাস পড়তে গেলে ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গলকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। কারণ শহরের বন্দর, শুল্ক, রপ্তানি, বিমা এবং ব্যাংক—সবই তখন একই অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর অংশ।

উনিশ শতক শেষ হল। বিশ শতকের শুরুতে ভারতীয় অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হতে লাগল। তখন প্রশ্ন উঠল—তিনটি পৃথক প্রেসিডেন্সি ব্যাংকের বদলে একটি বৃহৎ ব্যাংক গঠন করা যায় কি? দীর্ঘ আলোচনা শেষে ১৯২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গল, ব্যাঙ্ক অব বোম্বে এবং ব্যাঙ্ক অব মাদ্রাজ একীভূত হয়ে তৈরি হয় ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। এটি ছিল সেই সময়ের ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্যাংক। ইম্পেরিয়াল ব্যাংক একাধারে বাণিজ্যিক ব্যাংক, সরকারি ব্যাংকার এবং অনেকাংশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজও করত। ১৯৩৫ সালে রিজার্ভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে সেই আধা-কেন্দ্রীয় ভূমিকার অবসান ঘটে, কিন্তু দেশের বৃহৎ ব্যাংক হিসেবে তার গুরুত্ব অটুট থাকে। 

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা এল। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেল, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির জন্য তৈরি ব্যাংকিং ব্যবস্থা দিয়ে নতুন ভারতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।দেশের অধিকাংশ মানুষ তখন গ্রামে বাস করেন। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে, ক্ষুদ্র শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে, সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অথচ বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা তখন মূলত শহরেই সীমাবদ্ধ। এই বাস্তবতায় ১৯৫১ সালের অল ইন্ডিয়া রুরাল ক্রেডিট সার্ভে কমিটি সুপারিশ করে, এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র-সমর্থিত ব্যাংক গড়ে তোলা দরকার, যা গ্রামীণ ভারতকে অগ্রাধিকার দেবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই সংসদে আইন পাস হয় এবং ১৯৫৫ সালের ১ জুলাই ইম্পেরিয়াল ব্যাংক নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে—স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া। 

এটি শুধু নাম পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল দর্শনের পরিবর্তন। একটি ব্যাংক, যা আগে মূলত বাণিজ্যের সঙ্গী ছিল, এখন হয়ে উঠল উন্নয়নের সঙ্গী। ব্যাংক তখন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছল। স্টেট ব্যাংকের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্ভবত এখানেই। স্বাধীনতার পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখা বিস্তার শুরু হয়। কৃষিঋণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, গ্রামীণ সঞ্চয়, সরকারি প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ১৯৫৫ সালে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ৪৮০টি অফিসকে ভিত্তি করে শুরু হয় এই নতুন যাত্রা। 

একটি গ্রামের জন্য ব্যাংক শাখা মানে শুধু টাকা জমা রাখার জায়গা নয়; মানে অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। কত পরিবার প্রথম সঞ্চয়ী হিসাব খুলেছে এই ব্যাংকে। কত ছাত্র প্রথম শিক্ষাঋণ পেয়েছে। কত কৃষক প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ নিয়ে চাষ করেছে। এই ইতিহাসের অধিকাংশই কোনও সরকারি নথিতে লেখা নেই; আছে মানুষের স্মৃতিতে।

দুই শতাব্দীর দীর্ঘ যাত্রায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তিতে। একসময় মোটা চামড়ায় বাঁধানো লেজার ছিল ব্যাংকের প্রাণ। পরে এল টাইপরাইটার। তারপর কম্পিউটার। এরপর এটিএম, কোর ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ—ব্যাংকিংয়ের সংজ্ঞাই বদলে গেল। আজ মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডে যে লেনদেন সম্পন্ন হয়, তার পেছনে রয়েছে দুই শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সেই আস্থা। প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু ব্যাংকের মূল দায়িত্ব বদলায়নি—মানুষের বিশ্বাস রক্ষা করা।

কেন এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ? স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ইতিহাস আসলে তিনটি সময়কে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। প্রথম সময়—ঔপনিবেশিক ভারতের বাণিজ্য। দ্বিতীয় সময়—স্বাধীন ভারতের উন্নয়ন। তৃতীয় সময়—ডিজিটাল ভারতের আর্থিক রূপান্তর। এই তিনটি যুগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে একটি প্রতিষ্ঠান।

আজ কেউ যখন মোবাইলে টাকা পাঠান, তখন হয়তো তাঁর মনে পড়ে না যে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল কালি-কলম, সিলমোহর আর হাতের লেখা খাতার যুগে। কিন্তু ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই—অতীত কখনও হারিয়ে যায় না; নতুন রূপে বর্তমানের মধ্যেই বেঁচে থাকে। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে লালদিঘির পাশের যে ব্যাংকটি জন্ম নিয়েছিল, তার উত্তরাধিকার আজও প্রবাহমান। ভারতের অর্থনীতির উত্থান-পতন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতা, পরিকল্পিত উন্নয়ন, উদারীকরণ, তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব—সব কিছুর সাক্ষী থেকেছে সেই ধারাবাহিকতা। তাই এই ইতিহাস শুধু একটি ব্যাংকের নয়। এটি কলকাতারও ইতিহাস। এটি ভারতেরও ইতিহাস।আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি মানুষের বিশ্বাসের ইতিহাস—যে বিশ্বাস সময়ের সঙ্গে বদলায় না, বরং আরও গভীর হয়।

আরও অবকাশ খবর