অবকাশ
বৃটিশদের ত্রাস বাংলার ঘরের ছেলে রাসবিহারী বসু
প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন: ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সশস্ত্র বিপ্লবের ধারা এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। সেই ধারারই অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের মুক্তির লড়াইকে ছড়িয়ে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন বিপ্লবী রাসবিহারী বসু। ভারতের মাটি থেকে ব্রিটিশ শক্তির ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এবং সুদূর জাপানে বসে আজাদ হিন্দ ফৌজের মতো এক অপরাজেয় শক্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য রণকৌশল, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও অদম্য দেশপ্রেম। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বীরত্ব ও আজাদ হিন্দ ফৌজের শৌর্যের কথা বাঙালি তথা ভারতবাসীর মুখে মুখে ফিরলেও, তার প্রেক্ষাপট যিনি তৈরি করেছিলেন, সেই রাসবিহারী বসুর মহাজীবন আজ বহুলাংশেই অন্তরালে রয়ে গিয়েছে।
১৮৮৬ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার সুবলদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রাসবিহারী বসু। তাঁর পিতা বিনোদবিহারী বসু ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী। রাসবিহারীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় চন্দননগরে। ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরের মুক্ত হাওয়া এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর কিশোর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীতে কলকাতার ডাফ কলেজ থেকে তিনি শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন।
ছোটবেলা থেকেই রাসবিহারী ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও ডানপিটে স্বভাবের। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক তীব্র আকুলতা তাঁর রক্তের মধ্যে মিশে ছিল। কৈশোরেই তিনি ফরাসি সাহিত্য, ইতালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং গ্যারিবল্ডির জীবনকাহিনী পড়ে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন সারা বাংলার যুবসমাজকে আলোড়িত করেছিল, রাসবিহারীও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল অহিংসা বা আবেদনের রাজনীতি দিয়ে ব্রিটিশদের ভারত থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র আঘাত।
চন্দননগরের প্রখ্যাত বিপ্লবী চারুচন্দ্র রায়ের সংস্পর্শে এসে রাসবিহারী প্রথম সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি দেরাদুনের বন গবেষণা কেন্দ্রে (ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট) ক্লার্কের চাকরি নেন। কিন্তু এই চাকরি ছিল আসলে তাঁর ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ড আড়াল করার একটি চমৎকার কৌশল মাত্র। দেরাদুনে থাকার সময়েই তিনি বাংলার যুগান্তর দল এবং পাঞ্জাব ও উত্তর ভারতের বিপ্লবীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সমন্বয় সেতু গড়ে তোলেন।
রাসবিহারী বসুর জীবনের সবচেয়ে দুঃসাহসিক এবং যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটে ১৯১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পর, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হচ্ছিল। নতুন রাজধানী উদ্বোধনের জন্য এক বিশাল শোভাযাত্রা করে রাজকীয় হাতির পিঠে চড়ে যাচ্ছিলেন তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। দিল্লির চাঁদনি চক এলাকায় আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন রাসবিহারী ও তাঁর সহযোদ্ধারা। শোভাযাত্রাটি যখন চাঁদনি চকে পৌঁছায়, তখন তরুণ বিপ্লবী বসন্ত বিশ্বাস এক অভাবনীয় সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ভাইসরয়ের ওপর একটি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করেন।
বোমার আঘাতে ভাইসরয়ের দেহরক্ষী নিহত হন এবং হার্ডিঞ্জ মারাত্মকভাবে জখম হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সারা দেশে চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়, যা ইতিহাসে ‘দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ পুলিশ রাসবিহারীকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ায় ওস্তাদ রাসবিহারী এমনভাবে গা-ঢাকা দিলেন যে, স্বয়ং হার্ডিঞ্জ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন— এই ব্যক্তি এক অদৃশ্য ছায়ার মতো।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাসবিহারী বসু দেশের বাইরে থাকা ‘গদর পার্টি’র বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট— শত্রুর শত্রু আমাদের বন্ধু। ব্রিটিশ যখন ইউরোপের যুদ্ধে ব্যস্ত, তখন ভারতের ভেতরে অবস্থানরত ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বিদ্রোহ ঘটিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে হবে। রাসবিহারী, শচীন সান্যাল এবং পিংলে একযোগে ১৯১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গোটা উত্তর ভারত জুড়ে এক ঐতিহাসিক সেনা বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেন।
দুর্ভাগ্যবশত, দলেরই এক বিশ্বাসঘাতক সদস্যের মাধ্যমে এই পরিকল্পনার কথা ব্রিটিশ পুলিশের কাছে ফাঁস হয়ে যায়। পুলিশ তৎপর হয়ে সমস্ত সেনা ছাউনি সিল করে দেয় এবং বিপ্লবীদের গ্রেফতার করতে শুরু করে। এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ভারতের মাটিতে থেকে বিপ্লবী আন্দোলন চালানো রাসবিহারীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। সহযোদ্ধাদের অনুরোধে এবং ভারতের স্বাধীনতার লড়াইকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে অবশেষে তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯১৫ সালের মে মাস। ছদ্মনাম নিলেন ‘প্রিয়নাথ ঠাকুর’ (পি এন ঠাকুর)। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনি একটি জাপানি জাহাজে চড়ে ভারতের মাটি ত্যাগ করেন এবং জাপানে পৌঁছান। কিন্তু জাপানেও তাঁর জীবন সহজ ছিল না। ব্রিটিশ সরকার জাপানি প্রশাসনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে রাসবিহারীকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। জাপান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারের নোটিশ জারি করে।
এই চরম সংকটের সময়ে রাসবিহারীর পাশে দাঁড়ান জাপানের এক প্রভাবশালী জাতীয়তাবাদী নেতা তথা ‘ব্ল্যাক ড্রাগন সোসাইটি’র প্রধান তোয়ামা মিতসুরু। তিনি রাসবিহারীকে হিজা ক্রিয়েশন বা সোমা পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় দেন। সোমা পরিবারের বেকারি ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘকাল আত্মগোপন করে থাকেন তিনি। এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি সোমা পরিবারের কন্যা তোশিকো-কে বিবাহ করেন এবং জাপানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বিয়ের পর তাঁর ওপর থেকে আইনি বিপদ কেটে যায়, কিন্তু দেশের জন্য তাঁর মন সর্বদা ব্যাকুল থাকত। জাপানিদের ভারতীয় সংস্কৃতি ও রান্নার সঙ্গে পরিচয় করাতে তিনি সেখানে প্রথম ‘ইন্ডিয়ান কারি’ তৈরি করেন, যা আজও জাপানে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
জাপানের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর রাসবিহারী বসু সম্পূর্ণ নতুন উদ্যমে ভারতের স্বাধীনতার জন্য কাজ শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এশিয়ার পরাশক্তি জাপানের সাহায্য ছাড়া ব্রিটিশদের এদেশ থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি জাপানের মাটিতে ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লিগ’ (ভারতীয় স্বাধীনতা লীগ) প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪২ সালে ব্যাঙ্কক সম্মেলনে তিনি প্রবাসী ভারতীয় এবং ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে বন্দি ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠনের ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন। এই ফৌজের প্রথম সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল মোহন সিং। কিন্তু রাসবিহারী জানতেন, এই বিশাল বাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এবং ভারতের কোটি কোটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একজন ক্যারিশম্যাটিক ও যুবনেতার প্রয়োজন।
তিনি সুদূর জার্মানি থেকে সাবমেরিনে করে নিয়ে আসেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। ১৯৪৩ সালের ৪ জুলাই সিঙ্গাপুরের এক আবেগঘন সভায় রাসবিহারী বসু অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজের এবং ভারতীয় স্বাধীনতা লীগের সমস্ত দায়িত্ব তরুণ নেতা সুভাষচন্দ্রের হাতে তুলে দেন। তিনি সুভাষচন্দ্রকে ‘নেতাজি’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং নিজে ফৌজের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতে থাকেন। একজন প্রবীণ বিপ্লবীর এমন নিঃস্বার্থ ক্ষমতা হস্তান্তর ও ত্যাগের উদাহরণ ইতিহাসে বিরল।
দীর্ঘ নির্বাসন, নিরলস পরিশ্রম এবং দেশের চিন্তায় রাসবিহারী বসুর শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছিল। ১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি সুদূর জাপানের টোকিওতে এই মহান বিপ্লবী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার মাত্র দু’বছর আগে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। নিজের স্বাধীন স্বদেশের মাটি ছোঁয়া তাঁর আর ভাগ্য হয়ে ওঠেনি। জাপান সরকার ভারতের এই অকৃত্রিম বন্ধুকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান’-এ ভূষিত করেছিল।
রাসবিহারী বসু কেবল একজন সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী কূটনীতিবিদ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়েও দেশের মুক্তির জন্য লড়াই করা যায়। আজ স্বাধীন ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে এই মহান বিপ্লবীর আত্মত্যাগ ও বীরত্বকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা প্রত্যেক ভারতবাসীর কর্তব্য।

