বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপানো অগ্নিপুরুষ: মাস্টারদা সূর্য সেন ও আপসহীন স্বাধীনতার ইতিহাস

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট, ২০২৬
সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপানো অগ্নিপুরুষ: মাস্টারদা সূর্য সেন ও আপসহীন স্বাধীনতার ইতিহাস
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশেষ প্রতিবেদন: ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবাদের ইতিহাসে একটি নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে— মাস্টারদা সূর্য সেন। পরাধীন ভারতের অন্ধকার আকাশে তিনি ছিলেন এমন এক অগ্নিশিখা, যিনি কেবল একদল তরুণকে দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেননি, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অপরাজেয় অহংকারকে এক ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে ব্রিটিশ প্রশাসনকে যে জোরদার ধাক্কা দিয়েছিল, তার রণধ্বনি আজও প্রতিটি ভারতবাসীর ধমনিতে দেশপ্রেমের জোয়ার আনে।

১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় জন্ম হয়েছিল সূর্য সেনের। পেশায় শিক্ষক সূর্য সেনের সাধারণ জীবনযাত্রার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য দেশপ্রেমিক ও রণকৌশলী মন। বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন এবং যুগান্তর দলের আদর্শে দীক্ষিত হন। পড়াশোনা শেষ করে চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি ওখানকার ওরিয়েন্টাল স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। তাঁর শান্ত স্বভাব, অগাধ জ্ঞান এবং ছাত্রদের প্রতি স্নেহের কারণে তিনি সবার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং শিক্ষক থেকে রূপান্তরিত হন আপামর বিপ্লবীদের পরম শ্রদ্ধেয় ‘মাস্টারদা’-তে।
মাস্টারদা বিশ্বাস করতেন, কেবল অহিংস আন্দোলন বা আবেদনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের এ দেশ থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্মুখ সমরে আঘাত হানা। তিনি গড়ে তোলেন ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ (চট্টগ্রাম শাখা)। তাঁর জাদুকরী ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে দলে যোগ দেন অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, নির্মল সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তীর মতো তেজস্বী যুবকেরা। শুধু পুরুষরাই নন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্তের মতো বীরাঙ্গনাদেরও তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের মূল স্রোতে শামিল করেছিলেন, যা সেই সময়ে ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল। এই দিনটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক লাল হরফে লেখা অধ্যায়। মাস্টারদার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা এক সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রামের দুটি প্রধান ব্রিটিশ অস্ত্রাগার আক্রমণ ও লুণ্ঠন করেন। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ লাইন কেটে দেওয়া হয়, বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় রেল যোগাযোগ। চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ঘোষণা করে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠন করেন মাস্টারদা। ভারতবর্ষের মাটিতে ব্রিটিশদের ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য ভারতের বুকে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছিল।
অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ব্রিটিশ সেনা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে চট্টগ্রামকে। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে মাত্র গুটিকয়েক বিপ্লবী সাধারণ রাইফেল নিয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ে বসেন। সেই ঐতিহাসিক অসম যুদ্ধে বহু তরুণ বিপ্লবী শহিদ হলেও, বিপ্লবীদের চোরাগোপ্তা আক্রমণে ব্রিটিশ বাহিনীরও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়।
জালালাবাদের যুদ্ধের পর মাস্টারদা পাহাড়ের আদিবাসী ও গ্রামবাসীদের আশ্রয়ে আত্মগোপন করেন। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে তিনি ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে একের পর এক বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁদের প্রিয় 'মাস্টারদা'-কে আগলে রেখেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক দেশদ্রোহীর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে গৈরলা গ্রামে বিএসএফ বা তৎকালীন ব্রিটিশ ফোর্সের হাতে বন্দি হন তিনি।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর সূর্য সেনের ওপর নেমে আসে অমানুষিক ও পাশবিক অত্যাচার। ব্রিটিশ শাসকেরা এতটাই ভীত ছিল যে, বিচারে তাঁর ফাঁসির সাজা হওয়ার পর, ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ফাঁসির মঞ্চে তোলার আগে তাঁর দাঁত হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়, নখ উপড়ে নেওয়া হয় এবং নির্মমভাবে অত্যাচার করে তাঁকে অর্ধমৃত করে ফেলা হয়। অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মধ্যেও মাস্টারদার মুখ থেকে স্বদেশের জয়গান স্তব্ধ করা যায়নি। ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় জেলে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাঁর ফাঁসি দেওয়া হয় এবং তাঁর মৃতদেহটিকে লোহার খাঁচায় ভরে বঙ্গোপসাগরের বুকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাঁর চিতাভস্মও ভারতীয়দের মনে নতুন বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে না পারে।
মৃত্যুর ঠিক আগে সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর শেষ চিঠিতে মাস্টারদা লিখেছিলেন, "আমার শেষ বাণী— আদর্শের কথা ভুলো না। তোমাদের রক্তে যেন দাসত্বের কলঙ্ক মুছে যায়। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।" আজ স্বাধীনতার এই অমৃত মহোৎসবে দাঁড়িয়ে, মাস্টারদা সূর্য সেনের সেই মহান ত্যাগ ও আদর্শ আধুনিক ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে স্বাদেশীকতার এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

আরও অবকাশ খবর