বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

চেতনা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সমকালীন বিশ্বে শ্রীঅরবিন্দর দর্শন

প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট, ২০২৬
চেতনা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সমকালীন বিশ্বে শ্রীঅরবিন্দর দর্শন
দীপ্র ভট্টাচার্য (পেশায় ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্ট্যান্ট ও এ আই স্ট্র্যাটেজিস্ট)দীপ্র ভট্টাচার্য (পেশায় ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্ট্যান্ট ও এ আই স্ট্র্যাটেজিস্ট)
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

আজকের যুগ প্রযুক্তির যুগ। মানুষের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এখন মানুষের মতোই ছবি আঁকছে, কবিতা লিখছে, এমনকি জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানও করে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে একটা বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—তবে কি আগামীদিনে যন্ত্রই মানুষের জায়গা নিয়ে নেবে? মানুষের নিজস্ব শ্রেষ্ঠত্ব কি চিরতরে হারিয়ে যাবে? প্রায় এক শতাব্দী আগে ঋষি অরবিন্দ তাঁর দিব্য দর্শনে ঠিক এই ধাঁধারই উত্তর দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর 'বিবর্তনবাদ' এবং 'অতিমানস' তত্ত্ব আজকের এই প্রযুক্তি-নির্ভর যুগে পথপ্রদর্শকের কাজ করতে পারে।
 
শ্রী অরবিন্দ তাঁর দর্শনে বলেছিলেন, জড় বস্তু থেকে প্রাণ এবং প্রাণ থেকে মনের (Mind) বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু বিবর্তন এখানেই থেমে নেই। মানুষ বিবর্তনের শেষ ধাপ নয়, বরং একটি অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা মাত্র। মানুষের মনের ওপরেও রয়েছে এক উচ্চতর চেতনা, যাকে তিনি বলেছেন 'অতিমানস' বা 'Supermind'।আজ আমরা যখন AI-কে মানুষের বুদ্ধিমত্তার সমকক্ষ হতে দেখছি, তখন শ্রী অরবিন্দর এই তত্ত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। AI বড়জোর মানুষের 'মন' বা তথ্যের বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে নকল করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের যে অন্তহীন আধ্যাত্মিক চেতনা বা 'Consciousness', তা যন্ত্রের পক্ষে ছোঁয়া অসম্ভব। প্রযুক্তি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কেবল তথ্য ও বুদ্ধির জোরে মানুষ আর অনন্য নয়; মানুষের আসল শক্তি তার অন্তরের দিব্য চেতনায়।

বর্তমান যুগে AI সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু তথ্যের এই প্রাচুর্য কি মানুষকে প্রকৃত শান্তি বা প্রজ্ঞা দিতে পারছে? উত্তর হলো—না। শ্রী অরবিন্দর মতে, মন সবসময় খণ্ডিত সত্যকে দেখে, কিন্তু 'অতিমানস' বা পরম চেতনা সমগ্র সত্যকে একবারে উপলব্ধি করতে পারে।AI-এর কাছে ‘জ্ঞান’ (Knowledge) আছে, কিন্তু ‘প্রজ্ঞা’ (Wisdom) বা ‘বোধ’ নেই। ঋষি অরবিন্দের দর্শন আমাদের শেখায় যে, যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা যত উন্নতই হোক না কেন, তা কেবল একটি বাহ্যিক সরঞ্জাম। মানবজাতিকে যদি সত্যিই উন্নত হতে হয়, তবে বাইরের প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি ভেতরের চেতনার রূপান্তর ঘটাতে হবে। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মানুষের আধ্যাত্মিক জাগরণ আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

আজকের অতি-আধুনিক যুগে মানুষের জীবনে চরম মানসিক চাপ, একাকীত্ব ও অবসাদ গ্রাস করছে। শ্রী অরবিন্দর 'পূর্ণযোগ' (Integral Yoga) কোনো সংসারত্যাগের সাধনা নয়। তিনি বলেছিলেন, "All life is Yoga" অর্থাৎ জীবনই যোগ। তাঁর দর্শন অনুযায়ী, আমাদের দৈনন্দিন কর্ম, চিন্তা ও জীবনযাত্রাকে আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তরিত করতে হবে। আজকের যুবসমাজ যখন প্রযুক্তির গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে, তখন শ্রী অরবিন্দর এই পূর্ণযোগ মনের শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এক মোক্ষম ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

বর্তমান বিশ্ব একদিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে যেমন কাছাকাছি এসেছে, অন্যদিকে যুদ্ধ, হিংসা ও সংকীর্ণতায় খণ্ডিত হয়ে পড়ছে। শ্রী অরবিন্দ বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং মানব ঐক্যের (Human Unity) কথা বলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাহ্যিক কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চুক্তি দিয়ে বিশ্বে স্থায়ী শান্তি আসতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন মানুষের ভেতরের আত্মিক একতা। AI আজ যেভাবে গ্লোবাল ভিলেজ তৈরি করেছে, সেখানে শ্রী অরবিন্দর এই বিশ্বজনীন চেতনার দর্শনই পারে মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।

শ্রী অরবিন্দর দর্শন কোনো অবাস্তব কল্পনা নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি-উন্মাদ বিশ্বের জন্য এক চরম বাস্তব দিকনির্দেশনা। AI হয়তো আমাদের দৈনন্দিন কাজ সহজ করে দেবে, কিন্তু জীবনের আসল উদ্দেশ্য ও পরম সত্যের সন্ধান দেবে শ্রী অরবিন্দর দেখানো চেতনার আলো। তাঁর জন্মজয়ন্তীতে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার—আমরা কেবল যান্ত্রিকভাবে বুদ্ধিমান হব না, বরং ঋষি অরবিন্দর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের চেতনাকে এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাব।

আরও অবকাশ খবর