অবকাশ
রক্তে রাঙা স্বাধীনতা, ম্লানহীন মাতঙ্গিনীর লড়াই
প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে ক’জন বীর নারী নিজের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার বেদীমূল উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অগ্রগণ্য মেদিনীপুরের বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা। আজ এত বছর পরেও আপামোর ভারতবাসীর কাছে তিনি কেবল একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, বরং আত্মত্যাগ ও অদম্য সাহসের এক জীবন্ত প্রতীক। তমলুকের মেদিনীপুর গ্রামীণ এলাকা থেকে উঠে এসে কীভাবে একজন সাধারণ গ্রামীণ নারী ‘গান্ধীবুড়ি’ নামে আপামোর দেশবাসীর শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠলেন, সেই ইতিহাস আজও নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।
১৮৬৯ সালের ১৯ অক্টোবর পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থানার আলিনান গ্রামে এক অতি দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মাতঙ্গিনী। দারিদ্র্যের কারণে প্রথাগত শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিলেন তিনি। মাত্র ১২ বছর বয়সে আলিনান গ্রামেরই এক ষাটোর্ধ্ব নিঃসন্তান বিপত্নীক ত্রিলোচন হাজরার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিয়ের মাত্র ছ’বছরের মাথায়, ১৮ বছর বয়সে নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হন মাতঙ্গিনী। এরপর শুরু হয় তাঁর একাকী দীর্ঘ জীবনের কঠোর সংগ্রাম। নিজের বলতে কেউ না থাকায় গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত।
মাতঙ্গিনীর জীবনে আসল পরিবর্তন আসে ১৯৩২ সালে, যখন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে দেশজুড়ে ‘আইন অমান্য আন্দোলন’ শুরু হয়। তেষট্টি বছর বয়সের এক বৃদ্ধা, যাঁর ঘরকন্না ছাড়া বাইরের জগতের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না, তিনি মেদিনীপুরের রাজপথে গান্ধীবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মিছিলে শামিল হন। লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশ নিয়ে মেদিনীপুরের নোনা জল থেকে নুন তৈরি করার অপরাধে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন তিনি। বিচারে তাঁর ছ’মাসের কারাদণ্ড হয়। বন্দিজীবনে অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সংস্পর্শে এসে তাঁর ভেতরের দেশপ্রেমের আগুন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কারামুক্তির পর তিনি খদ্দরের কাপড় পরা শুরু করেন এবং চরকায় সুতো কেটে গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের পথে পুরোপুরি নিজেকে সঁপে দেন। এই কারণেই স্থানীয় মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ‘গান্ধীবুড়ি’ বলে ডাকতেন।
তাঁর জীবনের গৌরবোজ্জ্বল এবং চূড়ান্ত অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে মেদিনীপুরের জোনাল কংগ্রেস কমিটি তমলুক থানা, কোর্ট ও অন্যান্য সরকারি দপ্তর অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা সেই দিন এক বিশাল কৃষক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে তমলুক আদালতের দিকে এগিয়ে চলেন। হাতে ছিল স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা, আর মুখে ছিল ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি।
মিছিলটি যখন তমলুক শহরের সরকারি হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন ব্রিটিশ পুলিশ ও ফৌজ বাহিনী তাঁদের পথ আটকায়। দণ্ডবিধি ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অকুতোভয় মাতঙ্গিনী পিছপা হননি। তিনি পুলিশকে উপেক্ষা করে পতাকা উঁচিয়ে সমানে এগিয়ে যেতে থাকেন। তখনই ব্রিটিশ ফৌজ নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে।
প্রথম গুলিটি এসে লাগে মাতঙ্গিনীর বাম হাতে। রক্তে ভেসে যায় তাঁর শরীর। কিন্তু সেই অবস্থাতেও তিনি হাতের পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি। ডান হাতে পতাকাটি শক্ত করে ধরে আবার এগিয়ে যান। এরপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বুলেটটি এসে সশব্দে বিদ্ধ করে তাঁর কপাল ও বুক। নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মেদিনীপুরের এই বীর জননী। কিন্তু মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর হাত থেকে জাতীয় পতাকা মাটিতে পড়েনি, এবং ওষ্ঠাধর থেকে স্তব্ধ হয়নি ‘বন্দে মাতরম্’ স্লোগান।
মাতঙ্গিনী হাজরার এই অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে এক নতুন গতি দিয়েছিল। তাঁর শহিদ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মেদিনীপুর জুড়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ আছড়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠনে মূল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। আজ ভারতের স্বাধীনতার এত দশক পরেও মাতঙ্গিনী হাজরা আমাদের স্মরণে অমর। তাঁর আদর্শ, সততা এবং দেশের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, দেশপ্রেমের কোনও বয়স হয় না, শক্তির উৎস থাকে মানুষের অন্তরের বিশ্বাসে।

