বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

মাইন্ড গেমের নতুন জাদুকর: পি ভি সিন্ধুর কপালে ব্রেন মনিটরিং এআই ডিভাইসের রহস্য

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬
মাইন্ড গেমের নতুন জাদুকর: পি ভি সিন্ধুর কপালে ব্রেন মনিটরিং এআই ডিভাইসের রহস্য
দীপ্র ভট্টাচার্য  (পেশায় ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্ট্যান্ট ও এ আই স্ট্র‍্যাটেজিস্ট)দীপ্র ভট্টাচার্য  (পেশায় ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্ট্যান্ট ও এ আই স্ট্র‍্যাটেজিস্ট)
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

খেলার মাঠে অ্যাথলেটদের পেশীর শক্তি, দৌড়ের গতি কিংবা ফুসফুসের দম মাপার জন্য এতদিন হরেক রকমের ফিটনেস ট্র্যাকার বা স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবার খেলাধুলার লড়াইটা আর শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা সরাসরি ঢুকে পড়েছে মানুষের মস্তিষ্কের অন্দরে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন কোর্টে ভারতের তারকা শাটলার পি ভি সিন্ধুর কপালের পাশে একটি ছোট, বীন-আকৃতির অদ্ভুত ডিভাইস দেখা দেওয়ায় ক্রীড়ামহলে ব্যাপক কৌতুহল তৈরি হয়েছে। আসলে এটি কোনো সাধারণ ট্যাটু বা অলঙ্কার নয়, এটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত একটি অত্যাধুনিক ব্রেন মনিটরিং ডিভাইস, যার পরীক্ষামূলক নাম দেওয়া হয়েছে ‘টেম্পল’।

জোম্যাটো-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা দীপিন্দর গোয়েলের বিশেষ রিসার্চ টিমের তৈরি এই গেজেটটি মানুষের মাথার ‘টেম্পল রিজিয়ন’ বা রগ সংলগ্ন অংশে বসে রিয়েল-টাইমে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন এবং অক্সিজেনের মাত্রা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারে। সিন্ধুর অফ-কোর্ট পার্টনার ভেঙ্কট দত্ত সাই জানিয়েছেন, এই যন্ত্রটি শুধুমাত্র শারীরিক ধকলই মাপে না, বরং ম্যাচ চলাকালীন বা ঘুমের ঘোরে অ্যাথলেটের মাথায় ঠিক কী ধরণের চিন্তা চলছে এবং তাঁর ‘কগনিটিভ লোড’ বা মানসিক চাপ কতটা, তার একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ মানচিত্র তৈরি করে দেয়। সিন্ধুর মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের হাত ধরে স্পোর্টস সায়েন্সে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল বিপ্লব প্রমাণ করছে যে, আগামী দিনের ট্রফি জেতার লড়াইটা আসলে একটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

ক্রীড়াজগতে এই ধরণের প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য একেবারেই নতুন নয়। সিন্ধুর আগে টেবিল টেনিসের কিংবদন্তি জার্মান খেলোয়াড় টিমো বোল দীর্ঘদিন ধরে নিউরোফিডব্যাক সিস্টেম ব্যবহার করে আসছেন, যা তাঁকে ম্যাচের চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও বরফের মতো শান্ত থাকতে সাহায্য করে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ‘মিউজ এস অ্যাথেনা’ কিংবা ‘মেন্ডি নিউরোফিডব্যাক হেডব্যান্ড’-এর মতো বেশ কিছু বাণিজ্যিক ডিভাইস পাওয়া যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পেশাদার অ্যাথলেটদের মানসিক একাগ্রতা বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সিন্ধুর এই নতুন ডিভাইসটি আরও এক ধাপএগিয়ে সরাসরি মস্তিষ্কের মেটাবলিক চাহিদা বা বিপাকীয় প্রয়োজনকে ট্র্যাক করতে পারে। আধুনিক স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টে এই প্রযুক্তির ভূমিকা এখন অপরিসীম হয়ে উঠেছে, কারণ যেকোনো আন্তর্জাতিক স্তরের খেলায় জয় এবং পরাজয়ের ব্যবধান নির্ধারিত হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে। সেই ফ্র্যাকশন অফ আ সেকেন্ডে একজন খেলোয়াড় কতটা সঠিক এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, তা পুরোপুরি নির্ভর করে তাঁর মস্তিষ্কের সতেজতার ওপর। অনেক সময় দেখা যায় একজন খেলোয়াড় শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ ফিট থাকা সত্ত্বেও অতিমাত্রায় ম্যাচ খেলার মানসিক ক্লান্তির কারণে কোর্টে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন। এই এআই ব্রেন মনিটরিং প্রযুক্তি ঠিক এই জায়গাতেই কোচেদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি খেলোয়াড়ের অবচেতন মনের ক্লান্তি আগেভাগেই ধরে ফেলে টিম ম্যানেজমেন্টকে সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে, ফলে সঠিক সময়ে খেলোয়াড় বদল বা স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

ডিজাইন ও কার্যপদ্ধতির দিক থেকে বিচার করলে এই ডিভাইসটি অত্যন্ত হালকা এবং খেলোয়াড়দের জন্য আরামদায়কভাবে তৈরি করা হয়েছে। এতে অপটিক্যাল সেন্সর এবং ছোট ইলেকট্রোড ব্যবহার করা হয়, যা চামড়ার নিচে থাকা রক্তনালীর পরিবর্তন ও ব্রেন ওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সি রিড করতে পারে। খেলোয়াড় যখন কোনো শট মারার প্রস্তুতি নেন, তখন মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব অংশে কী পরিমাণ সিগন্যাল তৈরি হচ্ছে, তা ব্লুটুথের মাধ্যমে সরাসরি কোচের ট্যাবলেটে বা এআই অ্যাপ্লিকেশনে চলে যায়। ইনজুরি বা চোট প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি স্পোর্টস সায়েন্সকে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। যখন একজন খেলোয়াড়ের মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তাঁর রিফ্লেক্স বা প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় এবং তখনই মাঠে মারাত্মক চোট পাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এআই-এর নিউরোমরফিক কম্পিউটিং রিয়েল-টাইম বায়োমেট্রিক ডেটা বিশ্লেষণ করে খেলোয়াড়কে সতর্ক করে দেয়, যা তাঁদের কেরিয়ারের মেয়াদ দীর্ঘ করতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, একজন অ্যাথলেটের সেরা পারফরম্যান্সের জন্য রাতের ঘুম কতটা জরুরি, তা সবারই জানা। এই ডিভাইসটি ঘুমের গভীরতা এবং রাতের বেলা ব্রেনের অক্সিজেনের মাত্রা ট্র্যাক করে খেলোয়াড়দের অনিদ্রা বা ট্রাভেল ল্যাগ দূর করার জন্য সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক রুটিন তৈরি করতে সাহায্য করে।

তবে কয়েনের যেমন দুটি পিঠ থাকে, তেমনি এই যুগান্তকারী প্রযুক্তিরও বেশ কিছু জটিল সীমাবদ্ধতা এবং অসুবিধে রয়েছে। দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস বা এইমস (AIIMS)-এর চিকিৎসকদের মতে, এই ধরণের ডিভাইসগুলি এখনও পুরোপুরি চিকিৎসাবিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত বা প্রত্যয়িত নয় এবং মানবদেহের ওপর এদের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব জানতে আরও অনেক বড় মাপের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের প্রয়োজন রয়েছে। মেডিকেল ট্রায়াল ছাড়া এই ডিভাইসগুলির রিডিংকে ১০০ শতাংশ নির্ভুল বলে ধরে নেওয়াটা বিজ্ঞানের পরিপন্থী হবে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নিয়মকানুন বা রেগুলেশনের দিক থেকেও এটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অলিম্পিক কমিটি বা ওয়ার্ল্ড ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন (BWF) ম্যাচের লাইভ চ্যাটের মতো প্রযুক্তির অন-কোর্ট ব্যবহারের ওপর কড়া নজর রাখে। লাইভ ম্যাচে এই ডেটা ব্যবহার করে কোচ যদি খেলোয়াড়কে বাইরে থেকে কোনো মানসিক কৌশল বা 'রিয়েল-টাইম নিউরো-কোচিং' দেন, তবে তা অন্যান্য প্রতিযোগীদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা বা এক ধরণের 'টেকনোলজিক্যাল ডোপিং' হিসেবে গণ্য হতে পারে।তাছাড়া সবচেয়ে বড় যে ভয়ের জায়গাটি উঠে আসছে, তা হলো ‘ডেটা প্রাইভেসি’ বা তথ্যের সুরক্ষা। একজন খেলোয়াড়ের মস্তিষ্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল নিউরোলজিক্যাল ডেটা বা মনের ভেতরের চিন্তাভাবনা যদি কোনোভাবে হ্যাক হয়ে যায় বা বিপক্ষ দলের হাতে চলে যায়, তবে তা সেই খেলোয়াড়ের কেরিয়ার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

তাছাড়া এই ধরণের প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিকটিও বেশ চিন্তার কারণ। সিন্ধুর ব্যবহৃত ‘টেম্পল’ ডিভাইসটির প্রাথমিক মূল্য প্রায় আশি হাজার টাকা ধরা হয়েছে, যা সাধারণ বা উদীয়মান অ্যাথলেটদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। ফলে এই প্রযুক্তি যদি কেবল ধনী এবং সুপ্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা ক্রীড়াজগতে এক ধরণের বৈষম্য তৈরি করতে পারে। আরেকটি বড় মনস্তাত্ত্বিক অসুবিধে হলো যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। একজন খেলোয়াড় যখন পুরোপুরি এই ধরণের গ্যাজেটের ডেটার ওপর নির্ভর করতে শুরু করবেন, তখন তাঁর নিজের সহজাত খেলার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং মাঠে উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রযুক্তি কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু তা যেন কখনো মানুষের নিজস্ব মানসিক শক্তি বা ‘গাট ফিলিং’-কে গ্রাস না করে ফেলে, সেই ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, পি ভি সিন্ধুর কপালে থাকা এই এআই ব্রেন মনিটরিং ডিভাইসটি ভবিষ্যতের ক্রীড়াজগতের এক ঝলক মাত্র। আগামী দিনে খেলাধুলা কেবল মাঠের ঘাম বা পেশীর লড়াইয়ে আটকে থাকবে না, তা নিয়ন্ত্রিত হবে ল্যাবরেটরির অ্যালগরিদম এবং নিউরনের স্পন্দনে। তবে এই ডিভাইসগুলির বাণিজ্যিকীকরণের আগে এদের বৈজ্ঞানিক সত্যতা কঠোরভাবে যাচাই করা এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত ডেটার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নিয়ামক সংস্থাগুলির প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। তবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই আলো মানব প্রতিভাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলতে পারবে।

আরও অবকাশ খবর