অবকাশ
আর জি কর হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা ও ডা. রাধাগোবিন্দ করের ঐতিহাসিক লড়াই
প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদনঃ আজ ২৩ আগস্ট, কলকাতার চিকিৎসা ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। আজকের দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন এশিয়ার প্রথম বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বর্তমানের বিখ্যাত আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. রাধাগোবিন্দ কর। উনবিংশ শতকের পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের একচেটিয়া আধিপত্যের বাইরে এসে ভারতীয়দের জন্য সম্পূর্ণ দেশীয় উদ্যোগে একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল ও মেডিক্যাল স্কুল গড়ে তোলার এই যাত্রাপথ অত্যন্ত কঠিন এবং রোমাঞ্চকর ছিল।
১৮৫২ সালের ২৩ আগস্ট হাওড়ার সাঁতরাগাছিতে জন্মগ্রহণ করেন রাধাগোবিন্দ কর। তাঁর পিতা দুর্গাদাস কর ছিলেন সেই সময়ের এক নামী চিকিৎসক এবং কলকাতার মেডিক্যাল কলেজের প্রথম দিকের স্নাতক। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিবেশ রাধাগোবিন্দ ছোটবেলা থেকেই নিজের পরিবারে পেয়েছিলেন। কলকাতার হেয়ার স্কুল ও হিন্দু স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু চিকিৎসা শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই থিয়েটার ও নাট্যচর্চায় মেতে ওঠার অপরাধে পিতা দুর্গাদাস তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরবর্তী সময়ে থিয়েটারের মোহ কাটিয়ে ডা. রাধাগোবিন্দ কর আবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফিরে আসেন এবং পড়াশোনা শেষ করতে ১৮৮৩ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি দেন। সেখান থেকে অত্যন্ত সফলভাবে চিকিৎসাবিদ্যার ডিগ্রি অর্জন করে ১৮৮৬ সালে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন।
যুক্তরাজ্য থেকে ফিরে এসে রাধাগোবিন্দ অনুভব করেন যে, তৎকালীন ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনে থাকা সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ভারতীয় ছাত্র ও সাধারণ রোগীদের প্রতি তীব্র বৈষম্য করা হতো। উপরন্তু, মাতৃভাষা বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ব্রিটিশদের এই একচ্ছত্র আধিপত্য ও ঔপনিবেশিক মানসিকতাকে ভাঙতে তিনি একটি স্বাধীন ও অ-সরকারি মেডিক্যাল স্কুল তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
এই মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি পাশে পেয়েছিলেন ডা. মহেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডা. অক্ষয়কুমার দত্ত, ডা. কুন্দন ভট্টাচার্য এবং ডা. সুরেশ প্রসাদ সর্বাধিকারীর মতো তৎকালীন বাংলার অগ্রণী চিকিৎসকদের। অবশেষে, ১৮৮৬ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতার মেও হাসপাতালের চত্বরে কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়াই মাত্র কয়েকজন ছাত্র নিয়ে পথ চলা শুরু করে ‘দ্য ক্যালকাটা স্কুল অব মেডিসিন’। এটিই ছিল এশিয়ার বুকে প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় এবং বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
শুরুর দিনগুলো একেবারেই মসৃণ ছিল না। নিজস্ব কোনো স্থায়ী ভবন না থাকায় ভাড়া করা বাড়ি বা অস্থায়ী পরিকাঠামোয় এই শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা করতে হতো। একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ও কলেজের জন্য প্রয়োজন ছিল প্রচুর অর্থের। রাধাগোবিন্দ কর তাঁর সমস্ত সঞ্চয় এবং পৈতৃক সম্পত্তি এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাও পর্যাপ্ত না হওয়ায় তিনি কলকাতার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ঘরের কড়া নাড়তে শুরু করেন। অনেক সময় তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা মিলে থিয়েটারের বাইরে এবং কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেন। মানুষ ভালোবেসে তাঁদের থলিতে যা দিতেন, তা দিয়েই তিল তিল করে গড়ে উঠতে থাকে হাসপাতালের তহবিল। অবশেষে সংগৃহীত সেই অর্থে কলকাতার বেলগাছিয়া এলাকায় ১২ বিঘার একটি বড় জমি কেনা সম্ভব হয়।
১৯০২ সালে এই বেলগাছিয়া চত্বরে একটি নতুন হাসপাতাল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রাজপুত্র যুবরাজ অ্যালবার্ট ভিক্টরের ভারত আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং ব্রিটিশদের কাছ থেকে কিছু অনুমোদন আদায়ের কৌশল হিসেবে হাসপাতালটির একটি অংশের নামকরণ করা হয় ‘অ্যালবার্ট ভিক্টর হাসপাতাল’। মাত্র ৩০টি শয্যা (বেড) নিয়ে চালু হওয়া এই হাসপাতালটি উত্তর কলকাতার মানুষের কাছে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হয়। এরপর ১৯০৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি ‘কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস অব বেঙ্গল’-এর সাথে যুক্ত হয়ে এক বিরাট রূপ ধারণ করে।
ক্রমশ এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং চিকিৎসা শিক্ষার মান বাড়ার ফলে ১৯১৬ সালের ৫ জুলাই লর্ড কারমাইকেলের হাত ধরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তরিত হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘বেলগাছিয়া মেডিক্যাল কলেজ’। পরবর্তীতে এই কলেজের উন্নয়নে তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের বিশেষ অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ প্রতিষ্ঠানটির নাম বদলে রাখা হয় ‘কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজ’। ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই কলেজকে চূড়ান্ত এমবি স্ট্যান্ডার্ডের অনুমোদন দেয়।
রাধাগোবিন্দ করের মৃত্যুর (১৯ ডিসেম্বর, ১৯১৮) বহু বছর পর ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৭ সালের পর স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলেজটির আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করে। ১৯৪৮ সালে হাসপাতালের তহবিল মজবুত করার উদ্দেশ্যে কলকাতার এক বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী তৎকালীন রাজ্য সরকারকে ২ লক্ষ টাকা অনুদান দিতে রাজি হন, তবে শর্ত ছিল হাসপাতালটির নাম তাঁর পরিবারের কোনো এক সদস্যের নামে রাখতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায় কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যিনি নিজের জীবন, অর্থ ও রক্ত জল করে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁর নাম কোনোভাবেই মুছে ফেলা যাবে না। বিধানচন্দ্র রায়ের একক প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সালের ১২ মে সেই দাতার শর্ত প্রত্যাখ্যান করে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের নাম চিরকালের জন্য বদলে রাখা হয় 'আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল'। ১৯৫৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই হাসপাতালের সম্পূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়।
ডা. রাধাগোবিন্দ কর কেবল একজন দক্ষ চিকিৎসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজসংস্কারক এবং দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। ১৮৯৮ সালে কলকাতায় প্লেগ মহামারী দেখা দিলে তিনি ভগিনী নিবেদিতার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করেছিলেন। এ ছাড়া বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই লিখেও তিনি মাতৃভাষায় এই বিদ্যাকে সহজলভ্য করেছিলেন। আজকের দিনে তাঁর এই অসমসাহসী লড়াই এবং নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে স্বতন্ত্র খবর তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে।

