চিত্তবৃত্তনিরোধ করা
মনকে শান্ত স্থির করা, চিত্তবৃত্তিনিরোধ করাই হলো যোগ। মনকে শান্ত করার সঙ্গে সঙ্গে সেই নিস্তরঙ্গ মানসসরোবরে অখণ্ড ত্রিকাল প্রকাশিত হয়। মহাকবি কালিদাস তাঁর মহাকাব্য রঘুবংশের প্রারম্ভেই গুরু বশিষ্ঠের কাছে উপনীত রাজা দিলীপ ও রানী সুদক্ষিণার বিবরণ দিতে গিয়ে গুরুর এক আশ্চর্য জ্ঞানের কথা তুলে ধরেছেন। রাজা- রানী তাঁদের রাজ্যের সব কুশল জানালেন গুরুকে কিন্তু সেই সঙ্গে গভীর দুঃখের কথাও জানালেন। তাঁরা তখনও নিঃসন্তান, তাই পরে রাজবংশের অবসান হবে। ঋষি ক্ষণিক চুপ হয়ে গেলেন। যে মনরূপ হ্রদে সবসময় মৎসরা বা মীনেরা লাফিয়ে বেড়ায়,তারা যেন তখন ঘুমিয়ে পড়ল। হ্রদ তাই তখন হলো নিস্তরঙ্গ,অকম্পিত, নিশ্চল। সেই নিশ্চল হ্রদে ফুটে উঠল অতীতের এক সুস্পষ্ট ছবি। ঋষি দেখতে পেলেন এবং জানতে পারলেন মূল প্রতিবন্ধকতা কী, যার জন্য রাজদম্পতি নিঃসন্তান এবং তার প্রতিবিধানও করলেন। ফলে রঘু জন্মালেন ও রঘুবংশের ধারা রক্ষিত হল। মহকবি একটি ছোট্ট উপমায় কত বড় একটি প্রজ্ঞানের, মানস উপলব্ধির ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন তা আমাদের নজর পড়ে না। আমাদেরও মানসসরোবরে সর্বদাই ইন্দ্রিয়গুলি ওই মৎসদের মতো সবসময় সাঁতার দিচ্ছে, লাফিয়ে উঠছে। ফলে জল তোলপাড় করে দিচ্ছে। শান্ত সরোবর পাওয়া যায় না।মীনেরা যদি একটু ঘুমিয়ে পড়ে, অতলে তলিয়ে যায়, ভেসে না ওঠে তাহলে অনাকুল সেই হ্রদে সুনীল আকাশের স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব দেখা যায়। মন আমাদের সর্বদা আকুল এই দেখা-শোনা-ছোঁয়ার নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে। সেই ইন্দ্রিয়দের আমরা ঘুম পাড়াতে পারি না। তাদের আনা বিষয়ের জঞ্জাল দিয়েই মন আমাদের আবৃত হয়ে আছে সর্বদা। মনকে বিষয়মুক্ত করার কথা আমরা ভাবতেই পারি না। ভক্ত তাই আকুল হয়ে চিন্তা করেন, " বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন।" আমাদের ক্ষুদ্র পরিমিত সংকীর্ণ মন শুধু বর্তমান নিয়েই নিবদ্ধ। ঋষির যোগদর্শন এই সংযমেরই ফল। এর মধ্যে মহাকবির কোন কল্পনা বা অলৌকিকতা নেই। এরই নাম " যোগজ প্রত্যক্ষ"।

