কোষ্ঠকাঠিন্য: শুধু অস্বস্তি নয়, লুকিয়ে বড় বিপদ!
নিজস্ব প্রতিবেদন: ব্যস্ত জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম এবং কায়িক শ্রমের অভাব— আধুনিক নাগরিক জীবনের এই ত্র্যহস্পর্শে ঘরে ঘরে জাঁকিয়ে বসছে এক নিঃশব্দ ব্যাধি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যার নাম ‘কনস্টিপেশন’ বা কোষ্ঠকাঠিন্য। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি সাধারণ বা নিছক অস্বস্তিকর মনে হলেও, চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এই সমস্যা পুষে রাখলে তা ডেকে আনতে পারে কোলন ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ।
কখন বুঝবেন আপনি আক্রান্ত?চিকিৎসকদের মতে, একজন সুস্থ মানুষের দিনে অন্তত একবার স্বাভাবিক মলত্যাগ হওয়া জরুরি। তবে ব্যক্তিভেদে এই নিয়ম আলাদা হতে পারে। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা জানান, সপ্তাহে তিন বার বা তার কম মলত্যাগ হলে, এবং মল যদি অত্যন্ত শক্ত ও শুষ্ক হয়, তবে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য বলা চলে। এর পাশাপাশি পেট ভার হয়ে থাকা, তলপেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা, গ্যাস-অম্বলের আধিক্য এবং মলত্যাগের পরেও পেট পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি এই রোগের প্রধান লক্ষণ।
ভুল জীবনযাত্রাই কি মূল ভিলেন?চিকিৎসকরা এই ব্যাধির জন্য মূলত আমাদের রোজকার ভুল অভ্যাসগুলিকেই কাঠগড়ায় তুলছেন।
আঁশযুক্ত খাবারের অভাব: ফাস্টফুড, ময়দার তৈরি খাবার এবং অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার প্রবণতা অন্ত্রের গতিশীলতা কমিয়ে দেয়।
পর্যাপ্ত জল না খাওয়া: দিনে অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার জল না খেলে মল শুষ্ক ও শক্ত হয়ে যায়।শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: ডেস্কে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ এবং শরীরচর্চার অভাব এই সমস্যাকে আরও উস্কে দেয়।
বেগ চেপে রাখা: কাজের ব্যস্ততায় বা আলসেমিতে বাথরুমের বেগ চেপে রাখার অভ্যাস অত্যন্ত ক্ষতিকর।
অন্যান্য কারণ: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস কিংবা কিছু নির্দিষ্ট ব্যথানাশক ও আয়রন ট্যাবলেটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও এটি হতে পারে।
জটিলতা: মারাত্মক কোষ্ঠকাঠিন্যকে অবহেলা করলে তা ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী রূপ নেয়। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত জোর দেওয়ার ফলে মলদ্বারের শিরা ফুলে রক্তপাত শুরু হয়, যাকে চলতি ভাষায় ‘পাইলস’ বা অর্শ বলা হয়। এ ছাড়াও মলদ্বার ফেটে গিয়ে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক ‘অ্যানাল ফিশার’ কিংবা মলদ্বারের ভেতরের অংশ বাইরে বেরিয়ে আসার মতো (রেকটাল প্রোল্যাপ্স) জটিল অস্ত্রোপচারযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ঘরোয়া টোটকা বনাম চিকিৎসকের পরামর্শ: অনেকেই এই সমস্যায় পড়েন এবং লোকলজ্জার ভয়ে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে বাজারচলতি নানারকম জোলাপ বা ‘ল্যাক্সেটিভ’ ওষুধ খেতে শুরু করেন। চিকিৎসকদের কড়া হুঁশিয়ারি— চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া দীর্ঘদিন এসব ওষুধ খেলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু বদল আনলেই এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
খাবারে বদল: রোজকার পাতে রাখুন পর্যাপ্ত সবুজ শাকসবজি, ফল, ওটস এবং ডাল। ইসবগুলের ভুষি, পাকা পেঁপে, বেল বা আলুবোখারা (প্রুন) এই সমস্যায় মহৌষধের মতো কাজ করে।
জলই জীবন: পরিমিত জল পানের পাশাপাশি সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস ইষদুষ্ণ গরম জল খাওয়ার অভ্যাস অত্যন্ত কার্যকরী।সঠিক পজিশন: চিকিৎসকদের মতে, কমোড ব্যবহারের চেয়ে ভারতীয় কায়দায় (স্কোয়াটিং) মলত্যাগ করা পরিপাকতন্ত্রের জন্য বেশি বিজ্ঞানসম্মত। কমোড ব্যবহার করলে পায়ের নিচে একটি ছোট টুল বা ফুটস্টুল রাখলে উপকার পাওয়া যায়।
কখন যাবেন হাসপাতালে? হঠাৎ করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা শুরু হলে, মলের সঙ্গে রক্তপাত হলে, পেটে তীব্র ব্যথার পাশাপাশি বমিভাব এবং দ্রুত ওজন কমতে থাকলে আর একদিনও দেরি করা উচিত নয়। চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতাই এই ব্যাধি থেকে মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি।

