বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
সর্বশেষ খবর

গ্যারি সোবার্স - এআই-এর হিসেবের বাইরে এক ক্রিকেট-প্রতিভার পাঠ

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬
গ্যারি সোবার্স - এআই-এর হিসেবের বাইরে এক ক্রিকেট-প্রতিভার পাঠ
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

গ্যারি সোবার্স - এআই-এর হিসেবের বাইরে এক ক্রিকেট-প্রতিভার পাঠ

লেখক : দীপ্র ভট্টাচার্য 

একদিন হয়তো এমন সময় আসবে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রিকেট ম্যাচের প্রতিটি বলের ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পারবে। ব্যাটসম্যানের ফুটওয়ার্ক, বোলারের কবজির কোণ, ফিল্ডারের প্রথম পদক্ষেপ—সবকিছুকে সে ডেটায় পরিণত করবে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেই পথ অনেকটাই তৈরি হয়েছে। ম্যাচের সম্ভাব্য ফল, কোন ব্যাটসম্যান কোথায় বেশি রান করেন, কোন বোলারের বিরুদ্ধে কোন শটের সাফল্যের হার—সবই আজ ডেটার ভাষায় অনুমানযোগ্য।

কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু কিছু ঘটনা পরিসংখ্যানকে অস্বস্তিতে ফেলে। গ্যারি সোবার্সের প্রয়াণ তেমনই একটি মুহূর্ত। তাঁর জীবনকে স্মরণ করতে গিয়ে আবার মনে পড়ে—ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোঝা যায় না।

আজ ক্রিকেটের অভিধানে ‘অলরাউন্ডার’ একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকে গ্যারি সোবার্স সেই শব্দের অর্থই বদলে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল একজন ব্যাটসম্যান ছিলেন না; প্রয়োজনে নতুন বল হাতে দ্রুতগতির বোলার, কখনও বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনার, কখনও চিনাম্যান ও রিস্ট স্পিনে ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করেছেন। স্লিপে, আউটফিল্ডে কিংবা শর্ট লেগে—যেখানেই দাঁড়িয়েছেন, ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর। ওনার সময়, ও তার পরে পরেই ক্রিকেট ইতিহাসে বহু বড় অলরাউন্ডার এসেছেন—কিথ মিলার, কপিল দেব, ইমরান খান, ইয়ান বোথাম, জ্যাক ক্যালিস—কিন্তু বহুমাত্রিকতার দিক থেকে সোবার্স এখনও এক অনন্য মানদণ্ড।

সংখ্যাও তাঁর মহত্ত্বের সাক্ষী। ৯৩টি টেস্টে ৮,০০০-এর বেশি রান, গড় ৫৭-এরও বেশি, ২৬টি শতরান এবং ২৩৫টি উইকেট। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৩৬৫ রান—তখনকার বিশ্বরেকর্ড। আবার ১৯৬৮ সালে কাউন্টি ক্রিকেটে ম্যালকম ন্যাশকে এক ওভারে ছয়টি ছক্কা—যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ তাঁকে কেবল এই পরিসংখ্যানের জন্য মনে রাখেনি।

ক্রিকেটে কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাঁদের খেলা দেখার অভিজ্ঞতা সংখ্যার চেয়ে বড়। ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং, শেন ওয়ার্নের লেগস্পিন কিংবা ভিভ রিচার্ডসের উপস্থিতি—এগুলো কেবল স্কোরকার্ডে ধরা পড়ে না। সোবার্সও সেই বিরল বংশের মানুষ। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা, যেন তিনি হিসেব করে নয়, খেলাটিকে অনুভব করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সেই অনুভূতির ভাষা কোনও স্কোরবুক জানে না।

এখানেই এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আজকের এ আই বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে নিয়ম খুঁজে বের করে। সে শিখে নিয়ে তুলনা করে, সম্ভাবনা নির্ণয় করে। ক্রিকেটে এ আই ইতিমধ্যেই দল নির্বাচন, প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ, চোটের ঝুঁকি নির্ণয়, এমনকি ম্যাচ কৌশল তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনও ব্যাটসম্যান শর্ট বলে কতবার পুল খেলেন, কোন ওভারে রান তোলার হার কমে যায়, কোন বোলারের বিরুদ্ধে রিভার্স সুইপের সাফল্য কত—এসব বিশ্লেষণে মানুষের তুলনায় মেশিন অনেক দ্রুত।

কিন্তু এ আই-এর একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা আছে। সে অতীত থেকে শেখে। সে এমন কিছুর পূর্বাভাস দিতে পারে, যার কোনও না কোনও নিদর্শন আগে ছিল। কিন্তু ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মানুষদের বড় বৈশিষ্ট্য হল—তাঁরা প্রায়ই অতীতের নিয়ম ভেঙে নতুন নিয়ম তৈরি করেন।

সোবার্স সেই ধরনের ক্রিকেটার। যদি, একটি অ্যালগরিদমকে বলা হল—এই ম্যাচে একজন ক্রিকেটার কখন দ্রুতগতির বোলিং করবেন, কখন স্পিনে চলে যাবেন, কখন ব্যাট হাতে ঝুঁকি নেবেন, কখন রক্ষণাত্মক থাকবেন। সে নিশ্চয়ই আগের হাজারো ম্যাচের তথ্য বিশ্লেষণ করবে। কিন্তু সোবার্সের মতো একজন খেলোয়াড় অনেক সময় পরিস্থিতিকে কেবল পড়তেন না, তিনি পরিস্থিতির মানেই বদলে দিতেন। তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল অভিজ্ঞতা, অন্তর্দৃষ্টি, আত্মবিশ্বাস এবং মুহূর্তকে অনুভব করার ক্ষমতা—যাকে তথ্যবিজ্ঞানের ভাষায় পুরোপুরি মাপা এখনও সম্ভব নয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে—তথ্য আর প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়। তথ্য বলে দেয়, কোনও সিদ্ধান্ত অতীতে কতবার সফল হয়েছে। প্রজ্ঞা বলে দেয়, এই মুহূর্তে ব্যতিক্রম হওয়াই কি সঠিক সিদ্ধান্ত! ক্রিকেটের ভাষায় একে অনেকেই বলেন ‘গেম সেন্স’। এআই এই গেম সেন্সের কিছু অংশ অনুকরণ করতে পারে, কিন্তু তার উৎস যে মানুষের অভিজ্ঞতা, কল্পনা ও সাহস—সেটি এখনও অ্যালগরিদমের নাগালের বাইরে।

গ্যারি সোবার্সের জনপ্রিয়তার আর-একটি কারণ ছিল তাঁর সহজাত আকর্ষণ। তিনি মাঠে এমন এক স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস নিয়ে নামতেন, যা অহংকার নয়, আবার বিনয় প্রদর্শনের অভিনয়ও নয়। বড় খেলোয়াড়দের মধ্যে এই গুণটি প্রায়ই দেখা যায়। দর্শক তাঁদের কেবল রান বা উইকেটের জন্য ভালোবাসেন না; ভালোবাসেন কারণ তাঁরা খেলার সৌন্দর্যকে বড় করে তোলেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো একদিন বলে দিতে পারবে, কোন শটের সফল হওয়ার সম্ভাবনা কত শতাংশ। কিন্তু কোনও শট দেখে গ্যালারির হাজারো মানুষের একসঙ্গে নিঃশ্বাস আটকে যাওয়ার মুহূর্তটি সে কীভাবে মাপবে? একটি নিখুঁত কভার ড্রাইভের নান্দনিকতা, বা অসম্ভব এক ক্যাচের পর স্টেডিয়ামের নীরবতা—এসব কি ডেটাসেটে ধরা পড়ে?

হয়তো একদিন পড়বে। কিন্তু অনুভূতি আর তার পরিমাপ এক নয়। সোবার্সকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। তিনি এমন এক সময়ের ক্রিকেটার, যখন আজকের মতো ড্রোন ক্যামেরা, বল-ট্র্যাকিং, হক-আই বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশ্লেষণ ব্যবস্থা ছিল না। তবু তাঁর খেলা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আলোচিত। এর কারণ, মহান খেলোয়াড়েরা কেবল তাঁদের সময়কে অতিক্রম করেন না; তাঁরা সময়ের ভাষাও বদলে দেন।

আজ এআই-কে আমরা ‘মাল্টিমোডাল’ বলি—সে লেখা পড়ে, ছবি দেখে, শব্দ শোনে, বিশ্লেষণ করে। এই শব্দটি শুনলে সোবার্সের কথাই মনে পড়ে। ক্রিকেটেও তিনি ছিলেন যেন এক ‘মাল্টিমোডাল’ প্রতিভা—ব্যাট, বল, ফিল্ডিং, নেতৃত্ব, পরিস্থিতি বোঝা—সব মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ ক্রিকেট-চেতনা। তুলনাটি প্রযুক্তিগত নয়; প্রতীকী। আর সেই প্রতীক আমাদের শেখায়, বহুমাত্রিক প্রতিভাকে কেবল একটিমাত্র সূচকে বিচার করা যায় না।

গ্যারি সোবার্সের জীবন তাই এআই-এর ব্যাখ্যা করার ক্ষমতার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নয়। বরং উল্টোটা। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নত হবে, মানুষের সৃজনশীলতা, অন্তর্দৃষ্টি এবং কল্পনাশক্তির মূল্য তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে। মেশিন আমাদের সিদ্ধান্তকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও মানবিকতা এখনও মানুষেরই সম্পদ।

সম্ভবত ভবিষ্যতের কোনও এআই একদিন গ্যারি সোবার্সের প্রতিটি ইনিংস, প্রতিটি স্পেল, প্রতিটি ক্যাচ বিশ্লেষণ করবে। হয়তো সে বলবে, কোন সিদ্ধান্তটি পরিসংখ্যানগতভাবে সবচেয়ে কার্যকর ছিল। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর সে হয়তো কোনও দিনই দিতে পারবে না—কেন কয়েক প্রজন্মের ক্রিকেটপ্রেমীরা আজও সোবার্সের নাম উচ্চারণ করেন এমন এক মৃদু বিস্ময় নিয়ে, যেন তাঁরা একজন ক্রিকেটারকে নয়, এক বিরল মানবসম্ভাবনাকে স্মরণ করছেন। সংখ্যা ইতিহাস লিখে। কিন্তু কিংবদন্তি লেখে মানুষের স্মৃতি। আর সেই স্মৃতির ভাষা এখনও কৃত্রিম নয়; গভীরভাবে মানবিক।

আরও খবর