সন্ধিকো পকড়ো
আজ আন্তর্জাতিক যোগদিবস। যোগশাস্ত্রের প্রাচীন গবেষণাগার আমাদের দেশের ঋষিদের আশ্রমগুলি। যদিও যোগশাস্ত্র বিষয়ে আমরা উদাসীন। আমাদের কাছে এখন যোগ অর্থ হলো একটু শারিরীক ব্যায়াম,আর বড়জোর প্রাণায়াম। তাও এটি হুজুক আকারেই দেখি। আমরা এক একটি বিশেষ দিনকে উৎসবের আকারে উদযাপন করি কিন্তু পরে সারা বছর আবার ঘুমিয়ে থাকি। তবু ভালো যে একদিনও অন্তত আমরা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে মেতে থাকি। যোগের আসল কাজ মন নিয়ে। মন নিয়েই মানুষ, সে মননের অধিকারী। আবার মন নিয়েই যোগ। তাই যোগের অধিকার একমাত্র মানুষের। মানুষের মনের নানা অবস্থা। কখনো কখনো কারো কারো মন ঘুমন্ত বা নিষ্ক্রিয়, কারো বা দুরন্ত, ধাবন্ত বা সক্রিয়। আবার কারোও বা জীবন্ত বা শান্ত। যার হুঁশ আছে সেই মানুষ। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, মান হুঁশ। হুঁশ মানেই জীবন্ত, জাগন্ত বা সজীব মন ; ঘুমন্ত বা নির্জীব মন নয়। মনকে জাগানোর, সজীব করার প্রক্রিয়ার নামই যোগ। অধ্যাত্মসাধনার লক্ষ্য আত্মার বা মনের উত্থান, জাগরণ, নিবোধন। উপনিষদ বলছেন - উত্তিষ্ঠত, জাগ্ৰত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত। মনকে জাগাতে হবে, ফোটাতে হবে বিকশিত করতে হবে তা সে কর্মযোগ, ধ্যানযোগ, ভক্তিযোগ বা জ্ঞানযোগ—যেকোনো পথেই আমরা যেতে চাই না কেন। যোগ সকল পথের সঙ্গে, সকল সাধনার সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। শাস্ত্রে তাই বলা হয়েছে—"মন এব মনুষ্যণাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ" অর্থাৎ মানুষের বন্ধন ও মোচন বা মুক্তি এই দুয়েরই মূলে আছে একমাত্র মন। মলিন মনের ফলে হয় বন্ধন। স্বচ্ছ বা উজ্জ্বল মন এনে দেয় মুক্তি। মনের উপাদান তিনটি গুণ—সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ। এই ত্রিগুণময়ী প্রকৃতিই মনের জননী। রজোগুণের প্রাধান্যের জন্য আমরা ক্ষিপ্ত, চঞ্চল। আবার কারোও কারোও চিত্ত যেন কোন কিছুতেই সাড়া দেয় না, নড়তে চায় না। এই জাতীয় মনে বা চিত্তে তমোগুণের প্রাধান্য। এরই মাঝে কদাচিৎ একটু স্বচ্ছ, শান্ত, উজ্জ্বল ভূমির আভাস মেলে কারো কারো জীবনে। যেখানে চঞ্চলতাও নেই স্তব্ধতাও নেই, আছে এক অনাবিল শান্তি, পরম প্রসন্নতা। এটিই যেন একটি সন্ধিস্থল। ক্ষিপ্ত ও মূঢ় ভূমির মধ্যবর্তী অবস্থা। সন্ধিস্থল ব্যাপারটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দিন ও রাতের মাঝখানে সন্ধি স্থল হল প্রভাত বা সন্ধ্যাকাল। তাই এই সন্ধি স্থলকেই আমাদের ধরতে হয় আহ্নিককৃত্যের জন্য। মহাজনগণ বলছেন- সন্ধিকো পকড়ো। আঁকড়ে ধরো এই সন্ধিকে এই ফাঁক টুকুকে, যদি এই ভবকারাগার থেকে মুক্ত হতে চাও। বিক্ষেপ,চাঞ্চল্য, কর্মপ্রবাহ- এর অধীন থেকে মুক্তি মেলে একমাত্র ঐ সন্ধিক্ষণে। এই সময়কেই ধরতে হবে মুক্তির জন্য যোগ অভ্যাস করতে।

