হট টপিক
রাজকোষের ভারসাম্য বনাম ঋণের পাহাড়
প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬
নতুন সরকার গঠনের পর রাজ্যের মানুষের নজর ছিল একটিই বিষয়ের দিকে— কীভাবে পরিচালিত হবে আগামী দিনের আর্থিক রূপরেখা? অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিধানসভায় ৪,৩৮,৭৭৫.২৯ কোটি টাকার নতুন বাজেট পেশ করলেন রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী ডঃ স্বপন দাশগুপ্ত। একজন পেশাদার অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি এই বাজেটটিকে ব্যবচ্ছেদ করা যায়, তবে একে এক কথায় বলা চলে ‘ট্র্যাপিজের নিখুঁত খেলা’। যেখানে একদিকে রয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিগত সরকারের বিপুল ঋণের বোঝা, আর অন্যদিকে রয়েছে নতুন সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের পর্বতপ্রমাণ প্রত্যাশা। এই দুই বিপরীতমুখী চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে যেভাবে রাজকোষের স্বাস্থ্য ফেরানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলার অর্থনীতি যে তিমিরে নিমজ্জিত ছিল, সেখান থেকে উত্তরণের একটি স্পষ্ট দিশা এই বাজেটে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতকাল ধরে রাজ্যের একটি মস্ত বড় বদনাম ছিল ‘ধার করে ঘি খাওয়া’। অর্থাৎ, নিজস্ব রোজগার বাড়ানোর কোনও স্থায়ী বন্দোবস্ত না করে, দিনের পর দিন বাজার থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দৈনন্দিন বা সামাজিক উন্নয়নমূলক খরচ চালানো হতো। ডঃ দাশগুপ্ত তাঁর প্রথম বাজেটেই সেই পুরনো এবং বিপজ্জনক অর্থনৈতিক সংস্কৃতি থেকে রাজ্যকে বের করে আনার এক সাহসী চেষ্টা করেছেন।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো রাজকোষের ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা। চলতি অর্থবর্ষে রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি আগের ২.০৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.০২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, আর্থিক ঘাটতিও ৩.৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২.৯১ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের সহজ ভাষায় বুঝতে গেলে, এটি হলো নিজের উপার্জনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংসার চালানোর এক অত্যন্ত ইতিবাচক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। যখন কোনও পরিবার বা সরকার আয়ের চেয়ে ব্যয় কমানোর এবং নিজস্ব আয় বাড়ানোর চেষ্টা করে, তখন ভবিষ্যতের আর্থিক বুনিয়াদ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।
তবে এই যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ নয়। নতুন অর্থমন্ত্রীর কাঁধে চেপে বসে রয়েছে ৮,১৫,৮৯১ কোটি টাকার এক বিশাল ঋণের পাহাড়। এই বিপুল পরিমাণ ঋণের সুদ মেটাতেই রাজ্যের আয়ের একটা বড় অংশ প্রতি মাসে চলে যায়। ফলে, নতুন কোনও বড় পরিকাঠামো তৈরি বা নতুন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ঘোষণা করার ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর হাত অনেকটাই বাঁধা ছিল। কিন্তু ডঃ দাশগুপ্ত সেই সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়েও যেভাবে নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ওপর জোর দিয়েছেন, তা রাজ্যের অর্থনীতিকে এক নতুন সঞ্জীবনী দিতে পারে। কর ব্যবস্থার সরলীকরণ, ফাঁকি রোখা এবং নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GSDP) বাড়ানোই এখন এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এই বাজেটের অন্যতম বড় গুণ হলো এর বাস্তববাদিতা। সস্তা জনপ্রিয়তার আলোয় ভেসে না গিয়ে, করদাতাদের টাকার সঠিক মূল্যায়ন করার চেষ্টা হয়েছে এখানে। অনুৎপাদক খরচ কমিয়ে কীভাবে পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে জোয়ার আনা যায়, সেই লক্ষ্যই স্থির করেছেন অর্থমন্ত্রী। যদি সত্যিই সরকার এই ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যমাত্রাগুলি ছুঁতে পারে, তবে আগামী দিনে রাজ্যের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে আসবে। ফলে সুদের বোঝা কমবে এবং সেই উদ্বৃত্ত টাকা সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ডঃ স্বপন দাশগুপ্তের পেশ করা এই বাজেটটি কোনও জাদুদণ্ড নয় যে রাতারাতি রাজ্যের সমস্ত অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করে দেবে। কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবেই একটি সঠিক ও স্বাস্থ্যকর অর্থনৈতিক দর্শনের সূচনা। ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে লড়াই নতুন সরকার শুরু করল, তার সাফল্য নির্ভর করবে এর সঠিক রূপায়ণের ওপর। ট্র্যাপিজের এই খেলায় অর্থমন্ত্রী প্রথম ধাপে ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছেন, এখন দেখার আগামী দিনে তিনি রাজ্যকে কতটা সুরক্ষিত ভূমিতে পৌঁছে দিতে পারেন।

