আজ ও আগামীর পশ্চিমবঙ্গ - অর্থনীতির মানচিত্রে কী এক নতুন অভিযাত্রা?
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ
লেখক: দীপ্র ভট্টাচার্য
পশ্চিমবঙ্গ দিবস, ২০ জুন, ২০২৬, আমাদের শুধু একটি তারিখের সামনে দাঁড় করায় না, দাঁড় করায় একটি প্রশ্নের সামনে—পশ্চিমবঙ্গ কী ছিল, আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, আর আগামী দুই দশকে কোথায় পৌঁছতে চায়? এই দিনটির গুরুত্ব কেবল ঐতিহাসিক নয়; এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবারও একটি উপলক্ষ। কারণ কোনও রাজ্যের জন্মদিন আসলে তার আত্মসমীক্ষার দিন। এই দিনেই আমরা হিসেব কষতে পারি, কোথায় সাফল্য এসেছে, কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তুলতে চাই।
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ইতিহাস এক অর্থে ভারতের অর্থনীতির ইতিহাসেরই একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। ঔপনিবেশিক যুগে শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র, স্বাধীনতার পর উদ্বাস্তু স্রোতের অভিঘাত, পরবর্তী সময়ে শিল্পের স্থবিরতা, আবার পরিষেবা সেক্টর-এর উত্থান—এই দীর্ঘ যাত্রাপথে পশ্চিমবঙ্গ বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী। কিন্তু ইতিহাসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ভবিষ্যৎ। ভারত যখন ২০৪৭ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপনের লক্ষ্যে একটি বিকশিত অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের তাৎপর্য সেখানে অপরিসীম। কারণ ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে পূর্বাঞ্চলের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার, বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ এবং বিশাল মানবসম্পদের ভাণ্ডার—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ আগামী দিনের বৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে।
তবে উন্নয়নের প্রশ্নে প্রথমেই একটি সত্য স্বীকার করা জরুরি। কোনও রাজ্যের প্রকৃত সম্পদ তার খনিজ, তার জমি বা তার ভবন নয়; আসল হল, তার মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানবসম্পদ। এই রাজ্যের সাক্ষরতার হার, শিক্ষার ঐতিহ্য, জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি এবং অভিযোজন ক্ষমতা তাকে একটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। আগামী দুই দশকে যদি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে বড় বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান কেবল কারখানার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি, নবায়নযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল পরিষেবা এবং সৃজনশীল শিল্প আগামী দিনের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হবে। পশ্চিমবঙ্গের সামনে সুযোগ রয়েছে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার। তবে একইসঙ্গে ভুলে গেলে চলবে না যে, পশ্চিমবঙ্গ এখনও একটি কৃষিনির্ভর সমাজ। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ২০৪৭-এর পশ্চিমবঙ্গ কেবল আইটি পার্ক বা প্রযুক্তিনগরীর গল্প হতে পারে না। তাকে হতে হবে কৃষি ও প্রযুক্তির এক সৃজনশীল মেলবন্ধন। এ আই ব্যবহার করে, একজন কৃষক যখন আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর এবং আধুনিক কৃষি-পরামর্শ হাতের মুঠোয় পাবেন, তখন উৎপাদনশীলতা বাড়বে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়লে গ্রামের আয়ও বাড়বে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন গ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
একইভাবে শিল্পের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু আগামী দিনের অর্থনীতিতে শিল্প ও পরিষেবা—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদন, লজিস্টিকস, বন্দরভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, সবুজ প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পরিষেবা—এই সবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হবে নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি। এখানে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান একটি বড় সম্পদ। কলকাতা, হলদিয়া ও পরিকল্পিত দাদনপত্রবার বন্দর, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিকটবর্তী অবস্থান—সব মিলিয়ে এই রাজ্য পূর্ব ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু উন্নয়নের আলোচনা কখনও কেবল প্রবৃদ্ধির অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।অর্থনীতির ভাষায় একটি শব্দ রয়েছে—‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। অর্থাৎ উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছনো। পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের ওপর—উন্নয়নের সুযোগ কি কেবল শহরেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা পৌঁছে যাবে পাহাড়, জঙ্গলমহল, সীমান্ত অঞ্চল এবং উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতেও? যদি উত্তরটি দ্বিতীয়টি হয়, তবেই পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন স্থায়ী হবে।
আগামী দিনের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন থেকে শুরু করে নদী অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে ২০৪৭-এর উন্নয়নের মডেলকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি, সবুজ অবকাঠামো, সাস্টেনেবল নগরায়ণ এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে চলে আসবে।
আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবসে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের সামনে দুটি ছবি রয়েছে। একটি অতীতের—যেখানে সংগ্রাম, সাফল্য এবং অপূর্ণতার দীর্ঘ ইতিহাস। অন্যটি ভবিষ্যতের—যেখানে সম্ভাবনা, উদ্ভাবন এবং নতুন আত্মবিশ্বাসের প্রতিশ্রুতি।২০৪৭-এর পশ্চিমবঙ্গ কেমন হবে, তার উত্তর কোনও অর্থনীতিবিদের মডেল বা এ আই স্ট্র্যাটেজি বা ট্রেন্ড পরিসংখ্যান একা দিতে পারে না। সেই উত্তর লুকিয়ে আছে শ্রেণিকক্ষের ছাত্রের মধ্যে, গবেষণাগারের বিজ্ঞানীর মধ্যে, ক্ষেতের কৃষকের মধ্যে, উদ্যোক্তার সাহসের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের পরিশ্রমের মধ্যে, এবং অবশ্যই সরকারের উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনার মধ্যে।
তবু অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে একটি কথা স্পষ্ট। আগামী দুই দশকে যদি পশ্চিমবঙ্গ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, পরিবেশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর সমান গুরুত্ব দেয়, তবে বিকশিত ভারতের স্বপ্নপথে এই রাজ্য কেবল সহযাত্রীই হবে না, নেতৃত্বও দিতে পারবে।পশ্চিমবঙ্গ দিবস তাই অতীত স্মরণের দিন যেমন, তেমনি ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও দিন। কারণ কোনও সমাজের প্রকৃত শক্তি তার ইতিহাসে নয়, তার সম্ভাবনায়। আর সেই সম্ভাবনার দিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসী।

