"শিক্ষায় মাফিয়ারাজ চলবে না; আর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নয়, গুণমান বাড়ানোই লক্ষ্য"- বক্তব্য শিক্ষামন্ত্রীর
রিচা দত্ত, মুর্শিদাবাদ: গভর্নমেন্ট কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেক্সটাইল টেকনোলজি, বহরমপুরের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল বদলের ইঙ্গিত দিলেন শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।
শুক্রবারের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পূর্ণ মন্ত্রী ও মুর্শিদাবাদ বিধানসভার বিধায়ক গৌরী শংকর ঘোষ এবং বহরমপুরের বিধায়ক সুব্রত মৈত্র। মঞ্চ থেকে টেক্সটাইল কলেজের নতুন ডিজিটাল ম্যাগাজিনেরও উদ্বোধন করেন মন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বর্তমান পরিস্থিতি এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন ভাবনায় কীভাবে গড়ে তোলা যায়, কীভাবে "মডেল কলেজ" বানানো যায় তা তুলে ধরেন মন্ত্রীদ্বয়। তাঁরা জানান, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে শিক্ষার্থী-মুখী করার জন্য বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছেন।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "বাংলার উচ্চশিক্ষায় আজ বড় বদলের হাওয়া। একদিকে ওয়াল ঘরে বিএড কলেজ, প্রাইমারি স্কুলের ঘরে বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মী নেই। অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে রেকর্ড ৪ লক্ষ ছাত্র ভর্তি। সরকারের নতুন নীতি স্পষ্ট - সংখ্যা নয়, চাই গুণমান।"
ছাত্র ফেরানোই মূল লক্ষ্য-
মন্ত্রী বলেন, "পড়াশোনার জন্য পশ্চিমবঙ্গে কলেজ ক্যাম্পাসগুলিতে এতদিন ছাত্ররাই আসছিল না। আমাদের মূল কাজ আগে ছাত্র-ছাত্রীদের ফেরানো। কলেজ আকর্ষণীয় হোক, স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র রাজনীতিও আসবে। ছাত্র না থাকলে ক্যাম্পাস চলবে কি করে? তাই সরকারের প্রথম কাজ - কলেজকে আবার ছাত্রদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা।"
"ইউনিয়নবাজি নয়, আগে পড়াশোনা"-
কলেজের উন্নয়নের জন্য দুটি প্রাথমিক শর্তের কথা বলেন তিনি। "কলেজ চলে শিক্ষক আর ছাত্র নিয়ে। শিক্ষকরা সময়ে ক্লাসে আসবেন, পড়াবেন। আর ছাত্ররা ইউনিয়নবাজি না করে পড়াশোনা করবে। এই দুটোই উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত। গভর্নিং বডি তার অনেক পরে। অর্থাৎ কলেজ চালাতে গভর্নিং বডির আগে দরকার পড়াশোনার পরিবেশ।"
ভুয়ো কলেজের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ-
শিক্ষা ব্যবস্থায় "মাফিয়ারাজ" নিয়ে কড়া বার্তা দেন শিক্ষামন্ত্রী। "পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য চলবে না। ওয়াল ঘরের ঠিকানায় বিএড কলেজ, বাড়ির বারান্দায় ফার্মেসি কলেজ, উঠানের ঠিকানায় আইটিআই - এগুলো চলতে পারে না। ভুয়ো কলেজের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুরো পর্যবেক্ষণ শুরু হবে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রকদের বেঁধে দেওয়া বেঞ্চমার্ক যে কলেজ পূরণ করতে পারবে তারাই থাকবে।"
"সংখ্যা নয়, গুণমান" - নতুন রোডম্যাপ-
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেহাল দশার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। "পশ্চিমবঙ্গে এখন পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পঞ্চাশ-ষাটটি করে শিক্ষার্থী। তৈরি হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো দিয়ে। একটাও কর্মী নিয়োগ করা হয়নি। নতুন করে তৈরি করতে হবে। উত্তরবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার পর সেগুলিকে চলমান রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।"
তাই সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি, "আর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নয়। আমাদের মূল কাজ যে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে সেগুলিকে মডেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত করা, পরিকাঠামো বাড়ানো। মুর্শিদাবাদের মতো বড় জেলার ছাত্রসংখ্যা দেখলেই বোঝা যায় কেন। সংখ্যার বদলে সরকার এখন গুণমান ভাবছে।"
ক্যাম্পাসে ফিরছে আস্থা-
ইতিবাচক তথ্য দিয়ে মন্ত্রী বলেন, "সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে চার লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হচ্ছে। ৬ লক্ষ উচ্চমাধ্যমিক পাশের মধ্যে ৫০-৬০ হাজার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হচ্ছে, ১ লক্ষ বাইরে পড়তে যাচ্ছে। বাকি ৪ লক্ষ বাংলার ক্যাম্পাসেই থাকছে। তার অর্থ ক্যাম্পাসে আস্থা ফিরছে।"
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কলেজের পড়ুয়াদের বক্তব্য, "আগামী দিনে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন করা হলে আর কেউ নিজের জায়গা ছেড়ে অন্য রাজ্যে পড়াশোনা করতে যাবে না।"

