সর্বশেষ খবর
মহিলাদের স্বনির্ভরতার নতুন দিশা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প
প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান যুগে একটি সুস্থ ও সবল সমাজ গঠনে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের এই স্বনির্ভরতার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প। সমাজের প্রতিটি স্তরের নারীদের, বিশেষ করে গ্রামীণ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের মহিলাদের স্বাবলম্বী করে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল মহিলাদের হাতে কিছু আর্থিক সাহায্য তুলে দেওয়া নয়, বরং তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে সমাজের মূল স্রোতে প্রতিষ্ঠার এক বলিষ্ঠ প্রয়াস।
সাধারণত মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে মহিলারা দৈনন্দিন ছোটখাটো প্রয়োজনের জন্য পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি মাসে সরাসরি মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক অনুদান পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই সুনিশ্চিত মাসিক আয় তাঁদের এক বড়সড় আর্থিক নিরাপত্তা জোগাচ্ছে। সংসারের জরুরি খরচ মেটানো, সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা নিজের চিকিৎসার জন্য এখন আর তাঁদের কারও কাছে হাত পাততে হচ্ছে না। এই সামান্য আর্থিক স্বাধীনতাই তাঁদের মনে তৈরি করছে এক বিশাল আত্মমর্যাদা।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা কেবল প্রতিদিনের সংসার খরচেই ফুরিয়ে যাচ্ছে না। বহু প্রত্যন্ত এলাকার দূরদর্শী মহিলারা এই সঞ্চিত অর্থকে পুঁজি করে স্বনির্ভরতার নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছেন। অনেকে এই টাকা জমিয়ে হাঁস-মুরগি পালন, ছাগল চাষ, দর্জি বা সেলাইয়ের কাজ, কুটির শিল্প অথবা বাড়ির পাশে ছোট মুদি দোকান শুরু করছেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (Self Help Group) মাধ্যমে একাধিক মহিলা একত্রিত হয়ে এই সরকারি অনুদানকে মূলধন বানিয়ে বড় ব্যবসার দিকেও পা বাড়াচ্ছেন। ফলে, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার আজ পরোক্ষভাবে রাজ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পের প্রসারে অনুঘটকের কাজ করছে।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নারীর সামাজিক ক্ষমতায়নে। যে মহিলারা আগে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্রাত্য থাকতেন, আর্থিক স্বনির্ভরতা আসার পর পরিবারে তাঁদের মতামতের গুরুত্ব বাড়ছে। কন্যা সন্তানদের পুষ্টি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে মায়েরা এখন স্বাধীনভাবে খরচ করতে পারছেন, যা পরোক্ষভাবে বাল্যবিবাহ রোধে এবং নারী শিক্ষার হার বাড়াতে সাহায্য করছে। ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং ও ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নিজে পরিচালনা করার ফলে গ্রামীণ মহিলাদের আর্থিক সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানও আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
যেকোনো কল্যাণমুখী প্রকল্পের আসল সাফল্য লুকিয়ে থাকে তার ধারাবাহিকতা এবং সঠিক রূপায়ণের ওপর। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যেভাবে বাংলার লক্ষ লক্ষ নারীর অন্দরমহলে এক নীরব আর্থিক বিপ্লব এনেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে এই প্রকল্পকে আরও ফলপ্রসূ করতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি যদি নারীদের উপযুক্ত বৃত্তিমূলক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে এই স্বনির্ভরতার আন্দোলন আরও গতি পাবে।
‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ আজ আর পাঁচটা সাধারণ সরকারি প্রকল্পের মতো শুধু খাতায়-কলমে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আজ নারী শক্তির জাগরণ এবং সমাজে লিঙ্গবৈষম্য দূর করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। নারীরা যেভাবে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন, তাতে বলাই যায়— অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার আগামী দিনে বাংলার মহিলাদের সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভর করে তুলতে এক সোনালী অধ্যায়ের রচনা করছে।

