সর্বশেষ খবর
কলকাতার হিন্দুদের বাঁচিয়েছিলেন গোপাল পাঁঠা: ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়
প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদনঃ ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট। অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে এক চরম অভিশপ্ত দিন। তৎকালীন মুসলিম লিগের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ডাকে শুরু হয়েছিল ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’। মুহূর্তের মধ্যে কলকাতা পরিণত হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী কসাইখানায়। ইতিহাসে যা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত। লীগের উগ্রপন্থী সমর্থকদের তাণ্ডবে কলকাতার বুকে যখন হাজার হাজার নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ প্রাণ হারাচ্ছিলেন, পুলিশ ও প্রশাসন যখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়, ঠিক সেই চরম সংকটের মুহূর্তে কলকাতার হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক যুবক— গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তবে কলকাতার মানুষ তাঁকে চিনতেন ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে।
নামের পেছনের ইতিহাস
গোপাল মুখোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম অগ্রদূত অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর পিসেমশাই। গোপালবাবুর পরিবার কলকাতার বউবাজার এলাকায় বসবাস করত। তাঁদের মাংসের পারিবারিক ব্যবসা ছিল। সেই সূত্রেই তাঁর নামের সঙ্গে ‘পাঁঠা’ শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়। তবে পেশায় যাই হোক না কেন, শরীরচর্চা, কুস্তি এবং এলাকার যুবকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ সুনাম ছিল।
১৯৪৬ সালের প্রতিরোধ এবং ‘জাতীয় বাহিনী’ গঠন
১৬ এবং ১৭ই আগস্ট কলকাতার পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে যায়, চারদিকে শুধু আগুন, লুণ্ঠন আর লাশের স্তূপ, তখন গোপাল পাঁঠা বুঝতে পেরেছিলেন যে শুধু চোখের জল ফেলে বা অহিংসার বাণী আওড়ে এই নারকীয় তাণ্ডব থামানো যাবে না। আঘাতের পাল্টা প্রত্যাঘাত না করলে কলকাতার হিন্দুদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ মুছে যাবে।
১৮ই আগস্ট তিনি নিজের অনুগামী ও কলকাতার যুবকদের নিয়ে গঠন করেন ‘জাতীয় বাহিনী’। নিজের ব্যবসার টাকা এবং স্থানীয় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের আর্থিক সাহায্যে তিনি অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করেন। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, "কেউ যদি আমাদের একটা লোক কাটে, আমরা তার বদলে তাদের তিনটে কাটব।" এই রণনীতি কলকাতার হিন্দুদের মনে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস জোগায়।
গোপাল পাঁঠার নেতৃত্বে ‘জাতীয় বাহিনী’ বউবাজার, কলেজ স্ট্রিট, মহাত্মা গান্ধী রোড ও শিয়ালদহ সংলগ্ন এলাকায় এমন দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে যে, আক্রমণকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। মাত্র তিন-চার দিনের মধ্যে পাল্টে যায় কলকাতার চিত্র। যে শক্তির দাপটে কলকাতা কাঁপছিল, গোপাল পাঁঠার দুর্ধর্ষ প্রতিরোধের মুখে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বহু ইতিহাসবিদের মতে, গোপাল পাঁঠা সেদিন অস্ত্র হাতে না দাঁড়ালে কলকাতার জনবিন্যাস চিরতরে বদলে যেত এবং পশ্চিমবঙ্গ হয়তো আজ ভারতের মানচিত্রেই থাকত না।
গান্ধীজির সঙ্গে সংঘাত
কলকাতার দাঙ্গা থামার পর মহাত্মা গান্ধী যখন শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কলকাতায় আসেন, তখন তিনি গোপাল পাঁঠাকে অস্ত্র সমর্পণ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু দূরদর্শী গোপাল পাঁঠা গান্ধীজির সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি গান্ধীজিকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, "আমি কেন অস্ত্র ছাড়ব? যখন মা-বোনদের ওপর অত্যাচার হচ্ছিল, তখন আপনার অহিংসা কোথায় ছিল? হিন্দুদের আত্মরক্ষার জন্য এই অস্ত্র তুলে নেওয়া হয়েছে, কোনো অপরাধ করার জন্য নয়।" পরবর্তীকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত হলে তিনি তাঁর অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন।
শেষ জীবন
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকলেও, বামপন্থী ও কংগ্রেসী ঘরানার ইতিহাসবিদদের অবহেলায় এই বীরের নাম পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রায় মুছে দেওয়া হয়েছে। তোষণ রাজনীতির শিকার হয়ে তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থান পাননি। ২০০৫ সালে এই মহানায়ক নীরবেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে বর্তমান প্রজন্মে কলকাতার রক্ষাকর্তা হিসেবে গোপাল পাঁঠার ইতিহাস ও অবদান নতুন করে চর্চায় উঠে আসছে।

