বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

যোগব্যায়াম-এর কুঁড়ে তত্ত্ব

প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬
যোগব্যায়াম-এর কুঁড়ে তত্ত্ব
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

২১ জুন বিশ্ব যোগ দিবস। এই খবরটা আমি প্রতি বছর জানতে পারি দু'ভাবে। এক, ফেসবুকে আর হোয়াটসঅ্যাপে আমার চেয়ে ছোট, বড় এবং চেহারায় পনেরো বছরের তরুণ বন্ধুরা যখন দু'পা মাথার পেছনে নিয়ে গিয়ে ছবি পোস্ট করে। দুই, টেলিভিশনে যখন দেখা যায়, ভোরবেলা হাজার হাজার মানুষ মাঠে বসে এমন সব ভঙ্গি করছেন, দেখে মনে হয় তারা সকলে একযোগে হারানো পাঁচ টাকার কয়েন খুঁজছেন। আমি যোগব্যায়াম থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকি। নিরাপদ দূরত্ব কথাটা ইদানীং খুব জনপ্রিয়। তবে আমার সঙ্গে যোগব্যায়ামের নিরাপদ দূরত্ব বহু আগের, স্কুল ছাড়ার পর থেকেই। আমার আর যোগের সম্পর্ক অনেকটা সেই আত্মীয়ের মতো, যিনি প্রতি দুর্গাপুজোয় বলেন, “একদিন কিন্তু তোমাদের বাড়ি যাব,” তারপর আর আসেন না।

যোগব্যায়ামও আমাকে বহুবার ডাক দিয়েছে। আমি যাইনি। কারণ, আমার শরীরের একটা নিজস্ব দর্শন আছে। শরীর মনে করে, যত কম নড়াচড়া করা যায় ততই মঙ্গল। পৃথিবীর ইতিহাসে যত বড় বড় সভ্যতা হয়েছে, সবই তো বসে বসেই হয়েছে। নিউটন যদি আপেল গাছের নিচে দৌড়তে থাকতেন, তাহলে মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার হত? রবীন্দ্রনাথ যদি প্রতিদিন পঞ্চাশটা সূর্যনমস্কার করতেন, তবে এত গান লিখতে পারতেন? ইতিহাস এসব প্রশ্নের উত্তর দেয় না।

তবু একবার আমি যোগব্যায়াম শেখার চেষ্টা করেছিলাম। বন্ধুরা বলল, "যোগ করলে শরীর নমনীয় হয়।" আমি উৎসাহিত হলাম। নমনীয়তা একটা মহৎ গুণ। অফিসে নমনীয় হতে হয়, সংসারে নমনীয় হতে হয়, বাজারে আলুর দাম শুনে মানসিকভাবে নমনীয় হতে হয়। ভাবলাম, এবার শরীরটাও একটু নমনীয় হোক।

প্রথম দিন ট্রেনার শিক্ষক বললেন, "শরীরকে শিথিল করুন।" 
আমি সঙ্গে সঙ্গে শিথিল করলাম।
তিনি বললেন, "এতটা শিথিল নয়।"
তারপর তিনি বললেন, "ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঝুঁকুন, হাত দিয়ে পায়ের আঙুল ছোঁয়ার চেষ্টা করুন।"
আমি ঝুঁকলাম।
পায়ের আঙুল অনেক দূরে।
আরও ঝুঁকলাম।
পায়ের আঙুল আরও দূরে চলে গেল।
মনে হল, এরা আসলে আমার পায়ের আঙুল নয়। প্রতিবেশীর।
শেষ পর্যন্ত আমি হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছলাম। শিক্ষক সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "শুরুতে এমনই হয়।"
আমি বললাম, "আমার ধারণা, শেষেও এমনই হবে।"

যোগব্যায়ামের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল এর নামগুলো।ভুজঙ্গাসন, শলভাসন, মকরাসন, উষ্ট্রাসন। শুনলেই মনে হয় যেন একটা ছোটখাটো চিড়িয়াখানা চলছে। আমি ছোটবেলা থেকেই জীববিজ্ঞানে ইন্টারেস্টেড ছিলাম না। ক্লাস টেন অবধি বাধ্যতামূলক পড়ে,ওই পাট চুকিয়ে দিয়েছিলাম। এখন বয়সকালে এসে আবার সাপ, পোকা, কুমির, উট—সবার অভিনয় করতে হবে কেন?

একদিন ইউটিউবে দেখে বাড়িতে নিজে নিজে যোগব্যায়াম করার চেষ্টা করছিলাম। ভিডিয়োর ভদ্রলোক বলছেন, "এটা খুব সহজ।"
এই 'খুব সহজ' কথাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ভিডিয়োর মানুষটি এমনভাবে নিজের শরীর ভাঁজ করলেন, যেন তিনি জন্মসূত্রে মানুষ নন, একটা ভাঁজ করা ছাতা।
আমি তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে এমন এক ভঙ্গিতে পৌঁছলাম, যেখান থেকে আর ফেরার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
স্ত্রী এসে বললেন, "এ কী করছ?"
আমি বললাম, "যোগ।"
তিনি খানিকক্ষণ দেখে বললেন, " প্রয়োজনে ডাক্তার ডাকব?"

বাঙালি পরিবারে যোগব্যায়ামের আরও একটা সমস্যা আছে। আপনি ভোরে উঠে মাদুর পেতে বসেছেন। ঠিক তখনই কেউ চা নিয়ে ডাকবে। কেউ বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দেবে। কেউ বলবে, "যেহেতু উঠেই পড়েছ, সিলিং ফ্যানটা একটু মুছে দাও।" যোগব্যায়ামের বইয়ে এসব বাধার উল্লেখ নেই। তারা ধরে নিয়েছে, আপনি হিমালয়ের গুহায় থাকেন। আপনার সংসার নেই, বিদ্যুতের বিল নেই, গ্যাস বুকিং নেই, স্কুলের ফি নেই।

আসলে বাঙালির সবচেয়ে বড় যোগব্যায়াম প্রতিদিনের জীবনেই হয়ে যায়। মাসের শেষে বেতন আর খরচের মধ্যে যে সেতুবন্ধন করা হয়, তার চেয়ে কঠিন আসন পৃথিবীতে আছে বলে আমার জানা নেই।লোকাল ট্রেনে দাঁড়িয়ে এক হাতে রড, অন্য হাতে ব্যাগ, কাঁধে টিফিন, কানে মোবাইল—এ এক বিরল যোগসাধনা। কলকাতার বাসে সিট না পেয়ে যে ভঙ্গিতে আধঘণ্টা ঝুলে থাকতে হয়, আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের আয়োজকেরা সেটা দেখলে নতুন আসন হিসেবে স্বীকৃতি দিতেন।

এমনকি মধ্যবিত্তের ঘুমও এক ধরনের যোগ। রাতে শোয়ার আগে ভাবছি, কাল থেকে নিয়মিত ব্যায়াম করব। সকালে উঠে ভাবছি, পরশু থেকে শুরু করাই ভালো। এই যে সংকল্প আর বাস্তবতার মধ্যে অবিরাম ওঠাবসা, এও তো এক মানসিক যোগ।

তবে যোগব্যায়াম নিয়ে আমার একটা গভীর শ্রদ্ধা আছে। কারণ, যারা নিয়মিত করেন, তাদের মুখে একটা আশ্চর্য শান্তি দেখা যায়। আমি সেই শান্তি পাই না। আমি শান্তি পাই দুপুরে গরম ভাত, আলুভাজা, বা আলুপোস্ত, বেগুন ভাজা আর ডাল খেয়ে। ট্যাংরা মাছের ঝাল, পাঁঠার মাংস, শেষ পাতে দই মিষ্টি থাকলে তো কথাই নেই। আসলে, কেউ পদ্মাসনে বসে শান্তি খুঁজে পান, আমি খাবার টেবিলে। পথ আলাদা, লক্ষ্য এক। তাই ২১ জুন এলে আমি যোগব্যায়াম-প্রেমীদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।তারা শরীরকে বাঁকান। আমি যুক্তি বাঁকাই। তারা সূর্যনমস্কার করেন। আমি সূর্য উঠেছে দেখে পর্দা টানি। তারা প্রাণায়াম করেন। আমি বিদ্যুতের বিল দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে জীবন নামক কঠিন আসনটিই আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।

শুধু পার্থক্য এই, তারা মাদুরের ওপর করেন, আর আমি সোফার বা বিছানার ওপর।